All About Rabindra Sangeet

রবীন্দ্র সঙ্গীতের সব কিছু

Geetabitan.com (since 2008)

Welcome to Geetabitan

Share this page

Is it merely music? A revelation

An analytic perception of Rabindra Sangeet under the spectrum of Kirtan and the Padas written by poets like Jaydev and Vidyapati.


শুধুই কি রবীন্দ্র-'সঙ্গীত'? একটি উপলব্ধি

Author

Author: Niloy Kumar Basak

A column, titled Is it merely music? A revelation, written by Niloy Kumar Basak on 13.08.2017.

Column Writers Index

Niloy Kumar Basak of Fulia, Nadia, West Bengal, is a multi-talented individual. His aura of talent spreads through his Acrelyic paintings, Playing on Esraj, Handloom industry of Fulia and several others. His popularity, spreads with his seriousness of teaching in a remote school in Nadia, adopting unique schemes for the development of personality of his students, and also several cultural activities in Fulia. Apart from his expartise in Geography with a Masters Degree he makes his time to delve into the tradition of Kirtan, which is a popular tradition in his area. He is an ardent follower of Rabindra Sangeet, a singer and a conservationist by nature

Published on 13th August, 2017.

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য তিনটি প্রধান মৌলিক চাহিদা হল খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান । তবে বর্তমানে শিক্ষাকে অপর একটি মৌলিক চাহিদা রূপে গণ্য করা হয় । শিক্ষা ব্যতীত মানুষের বিকাশ পরিপূর্ণ হয়না । প্রথম তিনটি মৌলিক চাহিদা থেকে শিক্ষার প্রভেদ রয়েছে; কারণ খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান হল জৈবিক চাহিদা নিবৃত্তির মাধ্যম আর শিক্ষা হল হল মানসিক তথা সাংস্কৃতিক চাহিদা নিবৃত্তির মাধ্যম । এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে এই শিক্ষা কেবলমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা নয়, এই শিক্ষা হল মানব মনের অন্তর্নিহিত সত্ত্বার পরিপূর্ণ বিকাশ - যার স্বরূপ নির্ধারণ করতে গিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন - "...শিক্ষা বলিতে কতকগুলি শব্দ শিখা নহে; আমাদের বৃত্তিগুলির শক্তিসমূহের বিকাশকেই শিক্ষা বলা যাইতে পারে; অথবা বলা যাইতে পারে - শিক্ষা বলিতে ব্যক্তিকে এমনভাবে গঠিত করা, যাহাতে তাহার ইচ্ছা সদ্বিষয়ে ধাবিত হয় এবং সফল হয় ।" রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এই শিক্ষা বহনের নয়, বাহনের ।

রবীন্দ্রসংগীতের আলোচনার ভূমিকা হিসাবে উপরোক্ত বিষয়টি একটু ভিন্নধর্মী মনে হতে পারে । কিন্তু একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, প্রকৃত শিক্ষার মধ্য দিয়েই একটি পরিপূর্ণ জাতি গঠিত হয় । শিক্ষার মাধ্যমে তারা তাদের অন্তর্নিহিত সত্ত্বাকে উপলব্ধি করে, সৃষ্টি করে আত্মার আনন্দ স্বরূপকে; ফলস্বরূপ জন্ম হয় ভাস্কর্য, চিত্রকলা, কাব্য ও সংগীতসহ বিবিধ ললিতকলার । কোনো জাতি অমরত্ব লাভ করতে পারে একমাত্র তার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ললিতকলার মধ্য দিয়ে । এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি বক্তব্য প্রনিধানযোগ্য; তিনি বলেছেন - "গ্রীস যে আজও অমর হয়ে আছে, সে তার ধন, ধান্যে, রাষ্ট্রীয়প্রতাপে নয়; আত্মার আনন্দরূপ যা-কিছু সে সৃষ্টি করেছে, তাতেই সে চিরদিন বেঁচে আছে ।" এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বর্তমান আলোচনায় তাই বলা যায় যে, প্রকৃত শিক্ষার আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে রবীন্দ্রোত্তরকালে যে সকল মননশীল ও সৃষ্টিশীল সত্ত্বার ক্রমবিকাশ ঘটেছিল বা আজও ঘটে চলেছে, তাদের মনের ক্ষুন্নিবৃত্তির বহুবিধ মাধ্যমের মধ্যে একটি অন্যতম মাধ্যম হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । আজ রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ; আমদের জীবন-মরণের সীমানার মাঝখানে যে ব্যবধান, তার মধ্যে দিয়ে অবিরাম দুর্বার গতিতে বয়ে চলেছে রবীন্দ্রকাব্যের ধারা; রবির কিরণে নব নব রূপে উদ্ভাসিত হয়ে চলেছে আমাদের বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত । রবীন্দ্রনাথের বহুবিধ সৃষ্টির মধ্যে যেটি আজ সবথেকে বেশী ব্যাপকতা নিয়ে বিরাজ করেছে সেটি হল 'রবীন্দ্রসংগীত' । বাঙালীদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের গানের জনপ্রিয়তা শুরু হয়েছিল তাঁর সময়কাল থেকেই এবং বিষয়টি জানা যায় ১৯১২ সালে W.B.Yeats-এর একটি লেখা থেকে । 'গীতাঞ্জলি'র আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন - "He is as great in music as in poetry, and his songs are sung from the west of India to Burma wherever Bengali is spoken." বঙ্গবাসীর জীবনে ও বঙ্গ সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রসংগীতের বিপুল প্রভাব ও প্রসারের দিকটিকে বিবেচনা করে অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তী তাঁর 'রবিকররেখা' বইতে লিখেছেন - "...তাঁর প্রয়াণের অন্তে শতবর্ষ, সপাদ-শতবর্ষ আর সার্ধ-শতবর্ষ অতিক্রম করে সেই গানের ধারা বেয়ে আর নৃত্য-ছন্দে তাপময় হয়ে আজও তাঁর সৃষ্টি-শতদল পাপড়ি মেলে চলেছে শুধু নয়, এখনকার চলমান স্পন্দিত বঙ্গ সংস্কৃতিকে তা পরিচালিত করে চলেছে । ...তাঁর গান বিনা প্রশ্নে অবিসম্বাদিত ভাবে জনমনেগৃহীত এবং প্রোথিত ।" রবীন্দ্রসংগীত আজ আর শুধুমাত্র সংগীতের সুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা যেন 'সীমার মাঝে অসীম' । রবীন্দ্রসংগীতের অনুশীলন ও অনুসন্ধানের মধ্যে দিয়ে মনের কোণের সব দীনতা, মলিনতা ধুয়ে গিয়ে যেন এক আলোকোদ্ভাসিত পরিপূর্ণ মানব মনের উন্মেষ ঘটে । কী আছে রবীন্দ্রনাথের গানে যে বিগত এক শতকেরও বেশি সময় ধরে তা মানবমননের আশ্রয় হয়ে উঠেছে ? 'রবীন্দ্রসংগীত'কি শুধুই সুর, তাল ও লয়ের সঙ্গতিতে গেয় 'সংগীত'? আলোচনাটির শিরোনামে একটি প্রশ্নবোধক যতি চিহ্নের ব্যবহার করা হয়েছে এই কারণেই । এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে যাবার পরেও রবীন্দ্রসংগীতের এত প্রাসঙ্গিকতা কেন ? তাহলে বিশেষ কিছু কি আছে এই গানের ভিতরে যা এতদিন ভেবে দেখিনি বা ভাবলেও উপলব্ধি করবার চেষ্টা করিনি ? এই প্রশ্নগুলি আমার মনকে ভাবিয়ে তুলেছে এবং নিজের ভাবনা ও উপলব্ধি গুলিকে একটা লিখিতরূপ দেবার ইচ্ছাতেই এই দুর্বলতম প্রচেষ্টা ।

'রবীন্দ্রসংগীত' কী সে বিষয়ে জানতে গেলে প্রথমে বোধহয় জানা প্রয়োজন রবীন্দ্রনাথের সংগীত রচনার সূত্রপাত কোন পরিবেশে ও কীভাবে হয়েছিল, কারণ স্রষ্টার রচনার প্রেক্ষাপটকে না জানলে তাঁর সৃষ্টিকে বোধহয় সঠিকভাবে অনুধাবন করা যায় না । রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল এমন একটি পরিবারে যে পরিবারটি হয়ে উঠেছিল তৎকালীন সময়ের সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক এবং এর সূত্রপাত হয়েছিল রামলোচন ঠাকুরের (১৭৫৪-১৮০৭) সময়কাল থেকে । সংগীতপ্রেমী রামলোচন সে সময়কার কলকাতার সংগীতমহলের এক অন্যতম পৃষ্ঠপোষক রূপে পরিচিত ছিলেন । তৎকালীন সময়ের কবি ও গায়কদের তিনি নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে গানের আসর বসাতেন এবং তৎকালীন কলকাতার সম্পন্ন পরিবারে সংগীতের প্রতি রুচি বিস্তারে তিনি একজন পথিকৃতের ভূমিকা নিয়েছিলেন । তাঁর সময় থেকেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে সংগীতপ্রীতি গড়ে ওঠার পথটি তৈরী হয় । রামলোচনের পর তাঁর দত্তকপুত্র (রামলোচনের ভ্রাতা রামমণি ঠাকুরের মধ্যম পুত্র) দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৪৬) -এর সাহচর্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায় ঠাকুর পরিবার তথা সমাজে ললিতকলার প্রসার ঘটে । সুকন্ঠের অধিকারী, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য (বিশেষতঃ ইতালীয়) সংগীতে বিদগ্ধ দ্বারকানাথ ছিলেন তখনকার নাট্যজগতের অন্যতম প্রধান ধারকও বাহক, সংগীতানুরাগী এবং সংগীতের পৃষ্ঠপোষক । তাঁর উৎসাহে জোড়াসাকোর ঠাকুরবাড়িতে সংগীত, চিত্রকলা ইত্যাদির অবাধ প্রবেশ ঘটেছিল । দ্বারকানাথের পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের(১৮১৭-১৯০৫) প্রচেষ্টায় ও তত্ত্বাবধানে ঠাকুরবাড়িতে সংগীতের যথেষ্ট প্রসার ঘটে এবং জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি হয়ে ওঠে তৎকালীন সংগীত শিক্ষক ও সংগীতবেত্তাদের সহাবস্থানপূর্ণ একটি নক্ষত্রমন্ডল ।এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বিষ্ণুচন্দ্র চক্রবর্ত্তী, কিশোরী চট্টোপাধ্যায়, শ্রীকন্ঠ সিংহ, মৌলা বক্স, রামকুমার মিশ্র, যদুভট্ট, শ্যামসুন্দর মিশ্র, রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী, অব্জ কুমার ভদ্র প্রমুখ । এইসব বিশিষ্টপণ্ডিতও সংগীত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে ও তত্ত্বাবধানে দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, হেমেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরন্দ্রনাথ, স্বর্ণকুমারী দেবী, রবীন্দ্রনাথ, প্রমুখ দেবেন্দ্রনাথের পুত্রকন্যাগণ; গগনেন্দ্রনাথ, গুণেন্দ্রনাথ প্রমুখ দেবেন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রগণ এবং দিনেন্দ্রনাথ, সৌমেন্দ্রনাথ, প্রতিভা দেবী, ইন্দিরা দেবী প্রমুখ দেবেন্দ্রনাথের পৌত্র-পৌত্রীগণ সংগীতের তালিম নিতে থাকেন এবং বলাবাহুল্য সংগীত বিষয়ে যথেষ্ট পারদর্শিতা অর্জন করেন । ঠাকুরবাড়িতে ধ্রুপদী ও হিন্দুস্থানী সংগীতের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশী গান যেমন-পাঁচালি, যাত্রাগান, কথকতা, কীর্তন প্রভৃতিও প্রচলিত ছিল এবং সেগুলির চর্চাও হত যথেষ্ট । রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, "আমাদের বাড়িতে নলদময়ন্তীর যাত্রা শুনেছি । ....আমার পিতার পরিচর ছিলেন কিশোরী চাটুজ্জে । পূর্ব-বয়সে সে ছিল কোনো পাঁচালির দলের নেতা । ....পাঁচালির যে গান তার কাছে শুনতুম তার রাগিণী ছিল সনাতন হিন্দুস্থানী, কিন্তু তার সুর বাংলা কাব্যের সঙ্গে মৈত্রী করতে গিয়ে পশ্চিমী ঘাঘরার ঘূর্ণাবর্তকে বাঙালি শাড়ির বাহুল্যবিহীন সহজ বেষ্টনে পরিণত করেছে ।"

সুতরাং জন্ম থেকেই বিভিন্ন ধরনের সংগীত ও বাদ্যের পরিবেশের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের বাল্য ও কৈশোরকাল অতিবাহিত হয়েছে এবং তাঁর মধ্যে ক্রমাগত সেইসব সুর, তাল ও লয়ের আত্মীকরণ ঘটেছে ।রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে সংগীতশিক্ষার পরিবর্তে সংগীতের আত্মীকরণ কথাটিই বেশী প্রযোজ্য । কারণ তিনি সংগীত শিক্ষকদের কাছে নিয়মিত ভাবে প্রথাগত পদ্ধতিতে তালিম নেননি । রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের মাধ্যমেই বিষয়টিকে অনুধাবন করা যেতে পারে। 'ছেলেবেলা'য় তিনি লিখেছেন- "বিষ্ণুর কাছে দিশি গান শুরু হয়েছে শিশুকাল থেকে । গানের এই পাঠশালায় আমাকেও ভর্তি হতে হল । ...আমার দোষ হচ্ছে -শেখবার পথে বেশিদিন আমাকে চালাতে পারে নি । ইচ্ছেমত কুড়িয়ে-বাড়িয়ে যা পেয়েছি, ঝুলি ভর্তি করেছি তাই দিয়েই ।" আবার 'জীবনস্মৃতি'তে তিনি জানিয়েছেন- "...আমাদের পরিবারে শিশুকাল হইতে গানচর্চার মধ্যেই আমরা বাড়িয়া উঠিয়াছি । আমার পক্ষে তাহার একটা সুবিধা এই হইয়াছিল, অতি সহজেই গান আমার সমস্ত প্রকৃতির মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল ।" রবীন্দ্রনাথের জীবনে তাঁর পারিবারিক সংগীতের প্রভাব সম্পর্কে শান্তিদেব ঘোষ জানিয়েছেন, "এইরূপ সঙ্গীতের একটি আবহাওয়া গুরুদেবের প্রথম জীবনকে ঘিরে রেখেছিল । তাই পরবর্তী জীবনে, বাণী ও রাগিণীকে সমান করে মিশিয়ে এবংরাগরাগিণীর নানা রূপ মিশ্রণের দ্বারা গান রচনা করা তাঁর পক্ষে এত সহজ হয়েছিল ।"১০

ধ্রুপদী, হিন্দুস্থানী ও বিভিন্ন ধরনের দেশী বাংলা গানের পরিবেশের মধ্যে বড় হয়ে উঠলেও সংগীত রচনায় রবীন্দ্রনাথের হাতেখড়ি বৈষ্ণব পদাবলী রচনার মধ্য দিয়ে যদিও প্রথমে তিনি কবিতা হিসাবেই এগুলি রচনা করেছিলেন এবং 'জীবনস্মৃতি'-তে তিনি একে উল্লেখও করেছেন 'ভানুসিংহের কবিতা' নামে । কিন্তু শুধুমাত্র কাব্য হিসাবে যে পদাবলীর রূপ সম্পূর্ণ হয় না তা হয়তো তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে এগুলির মধ্যে থেকে অনেকগুলিতে তিনি সুর সংযোগ করে তাকে সংগীতের রূপ প্রদান করেছিলেন । তাই শুধু মাত্র কাব্য হিসাবে এগুলিকে বিশ্লেষণ না করে রবীন্দ্রনাথের সংগীত রচনার সূত্রপাত হিসাবে এর আলোচনা করলে বোধহয় সেটি খুব অসঙ্গত হবে না । মাত্র ষোলো বছর বয়সে বিদ্যাপতি-গোবিন্দদাসের ব্রজবুলি ভাষার মাধুর্যে আকৃষ্ট হয়ে তিনি তাকে নিজের মত করে রূপ দিয়ে প্রথম রচনা করলেন 'গহনকুসুমকুঞ্জমাঝে' । এই নব সৃষ্টির আনন্দে আপ্লুত হয়ে ক্রমাগত লিখে চললেন একের পর এক বৈষ্ণব পদ; সৃষ্টি হল 'ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী' (১৮৭৭) । কৈশোরে এই পদাবলী রচনার মধ্যেই বোধহয় প্রচ্ছন্ন ছিল রবীন্দ্রসংগীতের অঙ্কুর যা পরবর্তীকালে পরিণত হয়েছে একটি বিশাল মহীরূহে এবং যার ছায়ায় এসে শত বৎসরেরও অধিক সময় ধরে শীতল হয়ে চলেছে মানব-মানবীর হৃদয় ।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম সংগীত রচনা বৈষ্ণব পদাবলী হওয়ায় স্বভাবতই মনে প্রশ্ন আসে, তিনি কী এমন পেলেন বৈষ্ণব কবিদের রচিত পদগুলির মধ্যে যে মত্ত মধুকরের মত তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন পদাবলীর সুধারস পান করার জন্য ? তিনি বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন - একথাও বলা যাবে না কারণ বৈষ্ণব তত্ত্বের গহনে প্রবেশ করবার মত বয়স তখনও তাঁর হয়নি । তাছাড়া ঠাকুর বাড়িতে বৈষ্ণবধর্মের তেমন কোনো প্রভাব তো ছিলই না বরং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে ব্রাহ্মধর্ম তখন ঠাকুরবাড়ির সমস্ত সদস্যকে কমবেশী প্রভাবিত করেছিল । কৈশোরের উন্মেষলগ্নে পদাবলী সম্পর্কে তাঁর আগ্রহের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন - "বৈষ্ণব কবিতা পড়তে বালকের খুব ভালো লাগত; পদাবলীর ভাষা, ছন্দ, রস, ভাব সমস্তই তাঁকে মুগ্ধ করত । বলা বাহুল্য, তাঁর এই কাব্যপাঠ কাব্যরস-উপভোগের জন্য; বৈষ্ণবতত্ত্ব বোঝবার বয়স ও আগ্রহ তখনো হয়নি ।"১১ এই সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের নিজের কথা জানলে বিষয়টি একেবারে পরিষ্কার হবে; 'জীবনস্মৃতি'তে তিনি লিখেছেন, "গাছের বীজের মধ্যে যে-অঙ্কুর প্রচ্ছন্ন ও মাটির নীচে যে-রহস্য অনাবিষ্কৃত, তাহার প্রতি যেমন একটি একান্ত কৌতূহল বোধ করিতাম, প্রাচীন পদকর্তাদের রচনা সম্বন্ধেও ঠিক সেই ভাবটা ছিল । ...এই রহস্যের মধ্যে তলাইয়া দুর্গম অন্ধকার হইতে একটি-আধটি রত্ন তুলিয়া আনিবার চেষ্টায় যখন আছি তখন নিজেকেও একবার এইরূপ রহস্য-আবরণে আবৃত করিয়া প্রকাশ করিবার একটা ইচ্ছা আমাকে পাইয়াবসিয়াছিল ।"১২ লেখাটি পড়ে মনে হতে পারে যে, 'ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী' কিশোর কবির প্রাচীন কবিদের অনুসরণে কাব্য রচনা করবার একটি ইচ্ছা মাত্র । কিন্তু কিশোর রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র কাব্য হিসাবে পদ রচনা করেই থেমে থাকেননি, পরবর্তীকালে তাতে সুর সংযোগ করে তিনি সেগুলিকে পদাবলী কীর্তনের রূপ দিয়েছিলেন । রবীন্দ্রনাথ বৈষ্ণব পদ রচনা করেছিলেন বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি তাঁর অনুরাগ থেকে নয়, বরং পদাবলীর মধ্যে কাব্য ও সুরের যুগল সম্মিলনে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সংগীতের প্রকৃত ভাষাকে, যে ভাষা মনের উৎসস্থল থেকে উৎসারিত । পদাবলী কীর্তনের সহজ সরল অনাড়ম্বর রূপটিকে তিনি মননের অন্তর্জগৎ থেকে উপলব্ধি করেছিলেন । তাঁর মনে হয়েছিল, 'বৈষ্ণব কবিদের পদাবলী বসন্তকালের অপর্যাপ্ত পুষ্পমঞ্জরীর মত; যেমন তাহার ভাবের সৌরভ তেমনি তাহার গঠনের সৌন্দর্য' ।১৩ কীর্তন সম্পর্কে তাঁর মনের এই উপলব্ধিকে তিনি ব্যক্ত করেছেন এইভাবে - "চৈতন্য যখন পথে বাহির হইলেন তখন বাংলাদেশের গানের সুর পর্যন্ত ফিরিয়া গেল । তখন রাগরাগিণী ঘর ছাড়িয়া পথে বাহির হইল, একজনকে ছাড়িয়া সহস্রজনকে বরণ করিল । বিশ্বকে পাগল করিবার জন্য কীর্তন বলিয়া এক নূতন কীর্তন উঠিল ।"১৪ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পদাবলী সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ থেকে তিনি ও তাঁর অন্তরঙ্গ সাহিত্যিক বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদার সম্মিলিতভাবে সম্পাদনা করেছিলেন 'পদরত্নাবলী' নামক ১১০টি বৈষ্ণবপদের একটি সংকলন যা ১২৯২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে প্রকাশিত হয় এবং এখানে তিনি পনেরোটি বৈষ্ণব পদের ইংরেজি তর্জমাও করেছিলেন ।১৫ কীর্তন সম্পর্কে তাঁর এই উপলব্ধি জীবনসায়াহ্নে এসেও যে পরিবর্তিত হয়নি তা জানা যায় ১৯৩৭-এর ২৯ জুলাই দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপকুমার রায়কে লিখিত একটি পত্র থেকে । তিনি লিখছেন, "কীর্তনসংগীত আমি অনেক কাল থেকেই ভালোবাসি । ওর মধ্যে যে নিবিড় ও গভীর নাট্যশক্তি আছে সে আর-কোনো সংগীতে এমন সহজভাবে আছে বলে আমি জানি নে ।...রাগরাগিণীর রূপের প্রতি তার মন নাই, ভাবের রসের প্রতিই তার ঝোঁক ।"১৬ রবীন্দ্রনাথ সারা জীবনে বিভিন্ন সংগীত-সম্মেলনে, বক্তব্যে, আলোচনায়, গ্রন্থসমালোচনায় সংগীত হিসাবে কীর্তনের উৎকর্ষের কথা বারংবার বলেছেন । এখানে আরো একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে । দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রণীত 'আর্য্যগাথা' নামক সংগীত গ্রন্থটির সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে এক জায়গায় তিনি লিখছেন, "বঙ্গদেশের কীর্তনে কাব্য ও সংগীতের সম্মিলন এক আশ্চর্য আকার ধারণ করিয়াছে; তাহাতে কাব্যও পরিপূর্ণ এবং সংগীতও প্রবল । মনে হয় যেন ভাবের বোঝাই পূর্ণ সোনার কবিতা ভরা-সুরের সংগীত নদীর মাঝখান দিয়া বেগে ভাসিয়া চলিয়াছে ।"১৭ এরূপ অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য রচনাতে যা সব দিতে গেলে আলোচনা কেবল দীর্ঘায়িত হতে থাকবে । সুতরাং উপরোক্ত কয়েকটি উদাহরণের সাহায্যেই আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন ।

রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন হিন্দুস্থানী সংগীতের প্রথাগত রীতিকে এক প্রকার অস্বীকার করেছিলেন এবং সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন কীর্তনের মতই অনাড়ম্বর, কথা ও সুরের সমন্বয়ে বাংলা সংগীতের এক নবতম রূপ যা হয়ে উঠবে ভাষার মতই ভাবপ্রকাশের অপর এক মাধ্যম । কী এই 'কীর্তন' যাকে রবীন্দ্রনাথ বারবার তাঁর আলোচনার মধ্যে উত্থাপিত করেছেন ! 'কীর্তন' বলতে ঠিক কী বোঝায় তা আলোচনা করাটা বোধহয় এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক হবে না, কারণ কীর্তন সংগীতের যথার্থ অনুধাবনের মধ্যে দিয়েই আমরা রবীন্দ্রসংগীতকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারব বলে আমার ধারণা ।

'কীর্তন'(বানানভেদে 'কীর্ত্তন')শব্দটি সংস্কৃত 'কৃত' ধাতু থেকে উদ্ভুত । 'কীর্তন' শব্দের আভিধানিক অর্থ হল - ১। 'গুণকথন', 'যশঃখ্যাপন'; ২। কৃষ্ণলীলা-বিষয়ক সংগীত'; ৩। 'কথন', 'বর্ণন' ।১৮ ড.ক্ষুদিরামদাস কীর্তন সম্পর্কে বলেছেন - "কীর্তন শব্দের মূল অর্থ বর্ণন, নামোচ্চারণ । লোকপ্রসিদ্ধ অর্থ হল সুরযোগে গীত, গীতাকারে নাম, নাম-রূপ-গুণ এবং লীলার বর্ণন ।"১৯ সম্ভবত খ্রীস্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়কাহিনীমূলক পল্লীগীতির মাধ্যমে বঙ্গদেশে কীর্তনগানের উদ্ভব হয়েছিল ।২০ ভক্তকবি জয়দেব রাধাকৃষ্ণের প্রণয়কাহিনীমূলক এই পল্লীগীতির দ্বারা সম্ভবত প্রভাবিত হয়ে সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেছিলেন 'গীতগোবিন্দম্' যার মাধ্যমেই প্রথম বৈষ্ণবীয় কীর্তনের সূত্রপাত হয়েছিল । এরপর বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস প্রমুখ চৈতন্য-পূর্ববর্তী পদকারগণের রচিত রাধাকৃষ্ণের লীলাবিষয়ক পদসমূহ বৈষ্ণবীয় কীর্তনের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে তোলে । অতএব দেখা যাচ্ছে যে, কীর্তনগান উদ্ভবের মূল উদ্দেশ্যই হল রাধাকৃষ্ণের রূপ-গুণ ও লীলার বর্ণনা করা । বঙ্গদেশে কীর্তনগানকে বাংলা ভাষায় নামকীর্তনের মধ্য দিয়ে প্রসারিত করেছিলেন শ্রীচৈতন্য ।২১ চৈতন্যপূর্ব বা চৈতন্যসমকালে লীলাকীর্তনের কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না; সেইসময় জয়দেব-বিদ্যাপতি-চন্ডীদাসের পদগুলি মূলতঃ প্রবন্ধসংগীত হিসাবেই গাওয়া হত ।২২ চৈতন্যদেব নামসংকীর্তনকে তাঁর নব প্রবর্তিত ধর্মপ্রচারের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করলেও জয়দেব-বিদ্যাপতি-চন্ডীদাসের পদাবলী কীর্তনের মাধ্যমে তিনি তাঁর প্রেম-ভক্তি-বিলাস উপভোগ ও ব্যক্ত করেছেন – "চন্ডীদাস বিদ্যাপতি রায়ের নাটকগীতি / কর্ণামৃত শ্রীগীতগোবিন্দ । / স্বরূপ রামানন্দ সনে মহাপ্রভু রাত্রিদিনে / গায় শুনে পরম আনন্দ /"২৩ শ্রীচৈতন্যদেব কীর্তনের মাধ্যমে ভাবপ্রকাশের যে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিলেন তার প্রভাবে চৈতন্য সমকালীন এবং চৈতন্যোত্তর কালের বৈষ্ণব পদকর্তারা ভক্তিপূর্ণ চিত্তে বৈষ্ণবীয় ভজনের অঙ্গ হিসাবে বহু পদাবলী রচনা করেছিলেন এবং চৈতন্য পরবর্তীকালে এই পদগুলিকে বিষয় ও রাধাকৃষ্ণলীলার ক্রম অনুযায়ী সাজিয়ে কীর্তনের নতুন রূপ লীলাকীর্তন বা রসকীর্তনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সুতরাং একথা বলাই যায় যে, সংকীর্তন-প্রবর্তক চৈতন্যদেব লীলাকীর্তন বা রসকীর্তনের স্রষ্টা না হলেও তাঁর ভক্তিধর্মের একটি অন্যতম ফসল হল লীলাকীর্তন এবং তাঁর হাত ধরেই সামগ্রিকভাবে কীর্তনগানের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল । খ্রীস্টীয় ষোড়শ শতকের শেষের দিকে নরোত্তম দাস প্রবর্তিত 'খেতুড়ি বৈষ্ণব মহোৎসব'-এর মধ্য দিয়ে ধ্রুপদাদি রাগসংগীতের ধারায় কীর্তনের পুনর্নবীকরণ ঘটে এবং পরবর্তীকালের কীর্তনের বিভিন্ন ধারা-উপধারাগুলি এই গীতমহোৎসবেরই মূল্যবান সুফল ।২৪

কীর্তনের এই আলোচনা থেকে একে দুটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করা যেতে পারে । এর উৎপত্তিগত এবং প্রচার ও প্রসারের অভিমুখটির কথা বিবেচনা করে বলা যায় যে, প্রাক-চৈতন্যযুগ থেকে চৈতন্যযুগ হয়ে চৈতন্য-পরবর্তী যুগের প্রায় সমস্ত বৈষ্ণব পদকারগণ নিজেদের মনকে ভক্তিরসের দ্বারা সিক্ত করে রাধাকৃষ্ণের কাছে আত্মনিবেদেনের মাধ্যম হিসাবে পদাবলী রচনা করেছিলেন । এখানে সাহিত্য ও সংগীত সৃষ্টিছিল গৌণ, বৈষ্ণব সাধনার অঙ্গরূপেই মূলতঃ পদাবলীগুলি রচিত ও গীত হত । দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায় যে, পদাবলী তথা কীর্তন হল সেই প্রাচীন সাহিত্য ও সংগীত, শত শত বছর ধরে যার ক্রমাগত চর্চার মধ্যে দিয়েই বিকাশ ঘটেছে আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের । প্রথম বৈষ্ণব গীতিকাব্য 'গীতগোবিন্দম্'-এর রচয়িতা জয়দেব সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর মত – জয়দেব 'ভারতীয় সাহিত্যে প্রাচীনের অস্তরাগও আধুনিকের পূর্বরাগ' ।২৫ বাল্যকালে রবীন্দ্রনাথ ফোর্ট উইলিয়ামের প্রকাশিত বাংলা অক্ষরে ছাপা একটি 'গীতগোবিন্দ' খুঁজে পেয়েছিলেন এবং নিজের জীবনে তার প্রভাব সম্পর্কে নিজের স্মৃতিচারণে লিখেছেন, "সেই গীতগোবিন্দখানা যে কতবার পড়িয়াছি তাহা বলিতে পারিনা । জয়দেব যাহা বলিতে চাহিয়াছেন তাহা কিছুই বুঝি নাই, কিন্তু ছন্দে ও ভাষায় মিলিয়া আমার মধ্যে যে-জিনিসটা গাঁথা হইতেছিল তাহা আমার পক্ষে সামান্য নহে ।"২৬ কীর্তনের সাংগীতিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে একথা বলা যেতে পারে যে, কীর্তন হল কথা, সুর ও ভাবের 'ত্রিবেণীসংগম'। খগেন্দ্রনাথ মিত্র লিখেছেন, "...সুরের আবেদনে প্রাণ মাতিয়া উঠিবে, কাব্যের অলংকারে ও শব্দের ঝংকারে চিত্ত মুগ্ধ হইবে এবং ধর্মের প্রেরণায় অশ্রু কম্প পুলক প্রভৃতি সাত্ত্বিক ভাব হৃদয়ে জাগিবে – ইহাই কীর্তন সঙ্গীতের অভিপ্রায় ।"২৭ কীর্তনের ধর্মীয় দিকটির কথা চিন্তা করে এখানে তিনি কীর্তনকে 'সুর, কাব্য ও ধর্মের ত্রিবেণী' বলে উল্লেখ করলেও ভাবের বিষয়টি আনুষঙ্গিক ভাবেই এসে গেছে। কীর্তনে বাণী ও সুর পরস্পরের সাথে রাধাকৃষ্ণের মতই যুগলমিলনে আবদ্ধ; কেবলমাত্র সুরের বৈচিত্র্যে এগুলির পূর্ণ রূপ প্রকাশিত হয় না । উদাহরণস্বরূপ বিদ্যাপতির একটি পদের কথা বলা যায় যেটির সুর দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ -

এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর ।
এ ভরা বাদর,      মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর ।
ঝঞ্ঝা ঘন      গরজন্তি সন্ততি
ভুবন ভরি বরিখন্তিয়া ।
কান্ত পাহুন        বিরহ দারুণ
সঘন খর শর হন্তিয়া । ২৮

পদটিতে ভাষা ও সুর যেন পরস্পরের সাথে আলিঙ্গনবদ্ধ; এখানে যেমন কথাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় সুরের নেই তেমনই সুর ছাড়া একথাগুলির অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ নয় । বাণীর ওপর সুরের আধিপত্য বা সুরের ওপর বাণীর আধিপত্য - কোনোটিই এখানে নেই; এখানে তারা পরস্পরের লীলা সহচর, যুগল সম্মিলনে তাদের পূর্ণ রূপ প্রকাশিত - এই পূর্ণরূপের রসাস্বাদনে হৃদয়ে জাগে এক অদ্ভূত অনুভূতি ও ভাব । সাহিত্যের বিচারে বৈষ্ণব পদাবলীকে গীতিকবিতা বা লিরিক বলা যেতে পারে কারণ এগুলির মধ্যে গীতিকবিতার প্রায় সব বৈশিষ্ট্যগুলিই পরিলক্ষিত হয় । বৈষ্ণব পদাবলীকে গীতিকবিতা হিসাবে আখ্যায়িত করে ড.সত্য গিরি তাঁর 'বৈষ্ণব পদাবলী' গ্রন্থে বলেছেন - "লিরিক বা গীতিকবিতা ব্যক্তিচিত্তের আবেগ-অনুভবের একান্ত ব্যক্তিগত কাব্যরূপময় প্রকাশ । মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষের মনে কোনো আবেগ-অনুভবের সর্বোচ্চ স্তরটি যেহেতু দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হতে পারে না, সেহেতু লিরিকে দৈর্ঘ্যও হয় সংক্ষিপ্ত । … দীর্ঘ-বিতানিত কৃষ্ণকথাকে আশ্রয় করে যে বৈষ্ণব পদাবলী, তা সহজেই দীর্ঘাবয়ব হতে পারত, কিন্তু তা নাহয়ে যখন টুকরো টুকরো পদরূপ ধারণ করে, তখনই বোঝা যায়, পদগুলির সৃষ্টিমূলে কবিদের যে মানস-পরিস্থিতি কাজ করেছে তা লিরিকেরই স্বল্পস্থায়ী ব্যক্তিগত আবেগ অনুভবের উত্তুঙ্গ স্তর ।"২৯ শেষোক্ত এই দৃষ্টিভঙ্গীটিই বোধহয় পদাবলী সাহিত্য তথা কীর্তনের প্রতি রবীন্দ্রনাথের গভীর অনুরাগের কারণ । কীর্তনের মধ্যে বাণী, সুর ও ভাবের যে সংমিশ্রণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন তাই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল সংগীতের নব আঙ্গিক নির্মাণে । নিজের রচনায় বৈষ্ণব পদাবলীর প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন - "বৈষ্ণব পদাবলী … থেকে আমার গানের লিরিকের ভঙ্গী ও ভাষা গ্রহণ করবার সুযোগ পেয়েছিলেম …" ।৩০ রবীন্দ্রনাথের গানে কীর্তনের প্রভাব সম্পর্কে ড.ক্ষুদিরাম দাস বলেছেন - "কথার ঐন্দ্রজালিক ও সুরমিশ্রণের নবীন রাসায়নিক রবীন্দ্রনাথ কীর্তনকে বহুমান করেছেন, কারণ কীর্তনেই কথার সঙ্গে সুরের সামঞ্জস্য পূর্ব থেকে পরিস্ফুট ।"৩১ পূর্বে রবীন্দ্রনাথ-শ্রীশচন্দ্র সম্পাদিত যে 'পদরত্নাবলী' গ্রন্থের কথা বলা হয়েছে তার সম্পর্কে ড.বিমানবিহারী মজুমদার লিখেছেন - "পদরত্নাবলীই মহাজন পদাবলীর সর্বপ্রথম সংকলন যাহা বৈষ্ণব ধর্মের সাধন ভজনের অঙ্গ হসাবে লিখিত হয় নাই । বিশুদ্ধ সাহিত্যরস পরিবেশন করাই ইহার একমাত্র উদ্দেশ্য ।"৩২ সুতরাং একথা বলা যেতেই পারে যে, কীর্তনের প্রচলিত ধারণার আড়ালে রয়ে গেছে সংগীতের এক সুবৃহৎ ক্ষেত্র যার প্রভাবে বিভিন্ন ধরনের সংগীতের মধ্যে বেড়ে উঠলেও রবীন্দ্রনাথের সংগীত রচনার সূত্রপাত হয়েছিল বৈষ্ণব পদাবলী রচনার মধ্য দিয়ে ।

এই আলোচনার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনে বৈষ্ণব পদাবলী রচনায় আকৃষ্ট হওয়ার কারণটিকে বোধহয় কিছুটা হলেও অনুধাবন করা গেল । উপরোক্ত আলোচনা থেকে আরও একটি বিষয় পরিষ্কার যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের অনুপ্রেরণা হিসাবে কীর্তনকেই বারবার উল্লেখ করেছেন । এখানে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে যে রবীন্দ্রনাথ তো ইংরেজি, আইরিশ প্রভৃতি বিদেশী ভাষা; পাঞ্জাবী, মহীশূরী, কানাড়ী প্রভৃতি দেশীয় ভাষার পাশাপাশি ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পা, রামপ্রসাদী, বাউল প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের গানকে আশ্রয় করে বহু গান রচনা করেছেন । তাহলে এখানে কেবলমাত্র কীর্তনের কথাই বলা হচ্ছে কেন ? বিষয়টি একটু গভীরভাবে অনুচিন্তন করা প্রয়োজন না হলে আলোচনাটির মূল অভিপ্রায় ব্যর্থ হবে । রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন সংগীতের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সংগীত রচনা করলেও তার রচিত গানের মূল সুর ছিল কীর্তনের সাথে সম্পর্কিত । এখানে 'কীর্তনের সাথে সম্পর্কিত' আর 'কীর্তনাঙ্গের গান'- দুটি বিষয় একেবারেই এক নয় । রবীন্দ্রনাথের 'কীর্তনাঙ্গের গান' বলতে সেইসব গানগুলিকে বোঝায় যেগুলিরসুর কীর্তনের সুরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ । কীর্তনগানের সুরের একটি নিজস্ব ধরণ আছে যা কেবলমাত্র শ্রুতির মাধ্যমেই পরিস্ফুট হতে পারে; লেখার মাধ্যমে এই ধরণটিকে ব্যক্ত করা সম্ভব নয় । রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন কীর্তনাঙ্গের গান যেমন- 'মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না', 'ওহে জীবনবল্লভ, ওহে সাধন দূর্লভ', 'ওই আসনতলের মাটির পরে লুটিয়ে রব' প্রভৃতি শুনলে সেগুলির মধ্যে আমরা কীর্তনের একটা আভাস পাই যদিও রবীন্দ্রনাথ গানগুলি রচনার ক্ষেত্রে নিজস্ব রচনাশৈলী ব্যবহার করেছিলেন । কিন্তু এখানে সব রবীন্দ্রসংগীতের সাথেই কীর্তনের সম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে । রবীন্দ্রসংগীতের সম্পর্ক কীর্তনের উদ্দেশ্য, তার বিষয়বস্তু, আধ্যাত্মিকতার বা তার সুরের সাথে নয়, এই সম্পর্ক তার গঠন কাঠামোর সাথে । কীর্তনে কথা ও সুরের সংবদ্ধতায় সংগীতের যে রূপের উৎপত্তি ঘটেছিল তা ছিল বাঙলীর প্রাণের গান, হৃদয়ের অন্তঃকরণের সুপ্ত ভাবের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ । তিনি জানিয়েছেন - "আমরা যে গানের আদর্শ মনে রেখেছি তাতে কথা ও সুরের সাহচর্যই শ্রদ্ধেয়, কোনো পক্ষেরই আনুগত্য বৈধ নয় । সেখানে সুর যেমন বাক্যকে মানে, তেমনি বাক্যও সুরকে অতিক্রম করেনা ।"৩৩ তিনি মনে করতেন, কোনো একটি যদি অপরটিকে অতিক্রম করে যায় তাহলে সেখানে সংগীতের সামঞ্জস্য বিঘ্নিত হয় ।তিনি বিশ্বাস করতেন যে কথা ও সুরের মিলনের মধ্যে দিয়ে আধুনিক বাংলা গান একটি অপরূপ সৃষ্টি শক্তি নিয়ে প্রকাশিত হবে এবং এই আধুনিক বাংলা সংগীতের বিশেষত্বটিকে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন কীর্তনের মধ্যে । দিলীপকুমার রায়ের সাথে আলাপচারিতায় তাঁর এই উপলব্ধিকে তিনি ব্যক্ত করেছিলেন । তাঁর মতে - "বাংলা সংগীতের বিশেষত্বটি যে কী তার দৃষ্টান্ত আমাদের কীর্তনে পাওয়া যায় । কীর্তনে আমরা যে আনন্দ পাই সে তো অবিমিশ্র সংগীতের আনন্দ নয় । তার সঙ্গে কাব্যরসের আনন্দ একাত্ম হয়ে মিলিত । ... কীর্তনে সুর অবশ্য কম নয়; তার মধ্যে কারুনিয়মের জটিলতাও যথেষ্ট আছে । কিন্তু তা সত্ত্বেও কীর্তনের মুখ্য আবেদনটি হচ্ছে তার কাব্যগত ভাবের, সুর তারই সহায় মাত্র । ... উভয়ের যোগে যে সৌন্দর্য সম্পূর্ণতা লাভ করেছে, উভয়কে বিচ্ছিন্ন করে দিলে সেই সৌন্দর্যকে হারাতে হবে ।৩৪ ... কীর্তনে জীবনের রসলীলার সাথে সংগীতের রসলীলা ঘনিষ্ঠভাবে সম্মিলিত । জীবনের লীলা নদীর স্রোতের মত নতুন নতুন বাঁকে বাঁকে বিচিত্র । ... কীর্তনে এই বিচিত্র বাঁকা ধারায় পরিবর্ত্যমান ক্রমিক ভাবকে কথায় ও সুরে মিলিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছিল ।"৩৫ এই আলাপচারিতা থেকেই সহজে অনুমান করা যায় যে কীর্তনের সাথে নিজের গানের কোন সামঞ্জস্যের কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁর গানের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কেন কীর্তনের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন ।

রবীন্দ্রনাথ গান রচনা করতে গিয়ে সারা জীবন ধরে সংগীতের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গেছেন । পদাবলী রচনার অব্যবহিত পরেই তিনি তাঁর গান রচনার ক্ষেত্রে ভাবের দিকটিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন কারণ তাঁর কাছে তখন ভাবই ছিল সংগীতের মুখ্য বস্তু । ইতিমধ্যে তাঁর প্রথম বিলেত ভ্রমণ সম্পূর্ণ হয়েছে । প্রথমবার বিলেত থেকে ফিরে আসার পর তিনি দেশী ও বিদেশী সুরের সংমিশ্রণের মাধ্যমে সংগীতের এক নতুন রূপ সৃষ্টির মধ্যে মনোনিবেশ করেছিলেন বাড়ির বড়দের উৎসাহে, বিশেষ করে দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সাহচর্যে । ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয়েছিল 'বাল্মিকী প্রতিভা' (১৮৮১) ও 'কালমৃগয়া' (১৮৮২)-এর মত কালজয়ী গীতিনাট্য । এই গীতিনাট্য দুটির সংগীত রচনার ক্ষেত্রে তিনি বিদেশী সুরের যথেষ্ট প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন । এই রচনা দুটির সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "বাল্মিকী প্রতিভা ও কালমৃগয়া যে-উৎসাহে লিখিয়াছিলাম সে-উৎসাহে আর-কিছু রচনা করি নাই । ওই দুটি গ্রন্থে আমাদের সেই সময়কার একটা সংগীতের উত্তেজনা প্রকাশ পাইয়াছে ।"৩৬ এখানে 'আমাদের' বলতে রবীন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী প্রমুখের কথা বলা হয়েছে । রবীন্দ্রগানে বিদেশী গানের প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করে এই আলোচনাটিকে দীর্ঘায়িত করা বোধহয় ঠিক হবে না কারণ সেই আলোচনার মাধ্যমে আরেকটি প্রবন্ধ রচনার যথেষ্ট অবকাশ রয়ে গেছে । সেই অবকাশ রেখে বলা যায়, এই নব সৃষ্টিগুলি ছিল মূলতঃ সংগীতের পরীক্ষালব্ধ ফল ও বলাবাহুল্য, সর্বৈব সার্থক । 'বাল্মিকী প্রতিভা' অভিনয়ের প্রায় দুইমাস পরে কলকাতার বেথুন সোসাইটির অধিবেশনে তিনি সংগীত বিষয়ে একটি বক্তৃতা দেন যেটি 'সংগীত ও ভাব' নামে ভারতী পত্রিকায় ১২৮৮ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ।৩৭ এই প্রবন্ধে তিনি ভাবকেই সংগীতের সারবস্তু বলে চিহ্নিত করেছিলেন এবং গানের ক্ষেত্রে কথাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন । তিনি লিখছেন - "সংগীত কৌশল প্রকাশের স্থান নহে ভাব প্রকাশের স্থান, যতখানিতে ভাবপ্রকাশের সাহায্য করে ততখানিই সংগীতের অন্তর্গত, সংগীতের উদ্দেশ্যই ভাব প্রকাশ করা ।"৩৮ সংগীত ও ভাব বিষয়ে তাঁর এই প্রবন্ধটিকে নব পরীক্ষালব্ধ গীতিনাট্যের যুক্তিসঙ্গত বিশ্লেষণ বলে ধরলে বোধহয় ভুল হবে না । সংগীত সম্পর্কে এই ধারণা যখন রবীন্দ্রনাথের সংগীত রচনাকে প্রভাবিত করছিল ঠিক তখনই তাঁর সংগীত রচনার ক্ষেত্রে এক নতুন দিকের উন্মোচন ঘটল ব্রহ্মসংগীত রচনার মধ্যে দিয়ে ।'বাল্মিকী প্রতিভা' রচনায় সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মসংগীত রচনা শুরু করেন । এর কারণ হল, ১৮৮১ সালে ব্রাহ্মসমাজের বাৎসরিক অনুষ্ঠান 'মাঘোৎসব' আদি ব্রাহ্মমন্দিরের পরিবর্তে প্রথমবার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় ৩৯ এবং এর জন্য নতুন নতুন গান রচনার দায়িত্ব পড়েছিল বাড়ির সদস্যদের, বিশেষত রবীন্দ্রনাথের ওপর । এইসময়েও পরবর্তীতে রচিত ব্রহ্মসংগীতগুলিতে ধ্রুপদের প্রভাব লক্ষ্যকরা যায় । ব্রহ্মসংগীত রচনার সময়থেকেই রবীন্দ্রনাথ ভাবের সাথে কথা ও সুরকে সমান আসন দিয়েছিলেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কথা ও সুরের অর্ধনারীশ্বর রূপটিকেই তাঁর সংগীতে প্রাধান্যদিয়েছেন । ১৩১৯ সালে গান সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধে তিনি লিখছেন - "যে-মতটিকে তখন এত স্পর্ধার সঙ্গে ব্যক্ত করিয়াছিলাম সে-মতটি যে সত্য নয়, সে-কথা আজ স্বীকার করিব ।"৪০ ক্রমাগত সংগীত রচনার মধ্যে দিয়ে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে শুধুমাত্র ভাবের বাহক কথার দ্বারা সংগীত পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারেনা; ভাবপ্রকাশের অপর মাধ্যম সুরের সাথে মিলনেই তার সার্থকতা । তিনি বলেছেন - "বাংলার সুর কথাকে খোঁজে, চিরকুমারব্রত তার নয়, সে যুগলমিলনের পক্ষপাতী । বাংলার ক্ষেত্রে রসের স্বাভাবিক টানে সুর ও বাণী পরস্পর আপস করে নেয়, যেহেতু সেখানে একের যোগেই অন্যটি সার্থক।"৪১ আর বাণী ও সুরের মিলনে সৃষ্ট তাঁর নিজের গান রচনার প্রসঙ্গে তিনি জানাচ্ছেন, "আমার নিজের কবিত্বের ইতিহাসে দেখতে পাই গান-রচনা, অর্থাৎ সংগীতের সঙ্গে বাণীর মিলন-সাধনই এখন আমার প্রধান সাধনা হয়ে উঠেছে ।"৪২ এই কারণে তাঁর গান হল গীতিকাব্য যেখানে কথা ও সুর পরস্পরের সাথে যুগলমিলনে আবদ্ধ, দুটির গুরুত্বই এখানে সমান । রবীন্দ্রগানে কথার গুরুত্বের কথা বলতে গিয়ে 'রবীন্দ্রনাথের গান' প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু বলেছেন - "কাব্যের স্বাদে যে অভ্যস্ত, তার কাছে রবীন্দ্রনাথের গান শোনা যতখানি রোমাঞ্চকর, তাঁর গান পড়া তার থেকে কম নয় । রবীন্দ্রনাথের তিন-চারটির বেশি গান আমি একসঙ্গে পড়তে পারি নে, হৃৎস্পন্দন অতি দ্রুত হয়, গলা যেন আটকে আসে ।"৪৩ আবার রবীন্দ্রসংগীতে কথার পাশাপাশি সুরের সহাবস্থানের প্রসঙ্গে রবীন্দ্র-সংগীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত শোনার একটি অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন - "সোফায় বসে, বইয়ে চোখ রেখে গুনগুন গলায় গান করেন শৈলজারঞ্জন; … আর আমি, আমার হাতে দ্বিতীয় কপি বই, অনুধাবনকরি সুরের সঙ্গে কথার খেলা; এক রশ্মি বিচ্ছুরিত লীলাচঞ্চল গতিস্রোত; চলেছে যে যার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে- অবিকল, কিন্তু দুয়ে মিলে সৃষ্টি করেছে এক তৃতীয় পদার্থ, এক ভিন্ন সমন্বয়… ।"৪৪ এই হল 'রবীন্দ্রসংগীত' যার গঠন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এককথায় বলা যায় যে, রবীন্দ্রসংগীত হল কথা ও সুরের সংমিশ্রণে গঠিত একটি যৌগিক রূপ । জল যেমন হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সম্মিলিত রূপের একটিযৌগিক পদার্থ যেখান থেকে যেকোন একটিকে বাদ দিলেই জলের আর কোন অস্তিত্ব থাকে না ঠিক তেমনই 'রবীন্দ্রসংগীত' কেবলমাত্র সুরের প্রাধান্যে গেয় 'সংগীত' নয়, সেটি হল মনের মধ্যে অনির্বচনীয় অনুভূতি ও ভাব উদ্রেককারী বাণী ও সুরের একটি অখন্ড রূপ যেখানে একটিকে প্রাধান্য দিলে অপরটি তার মহিমা হারায় । নিজের গানের সরল ও আড়ম্বরহীন স্বকীয়তার কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- "আমি গান রচনা করতে করতে, সে গান বারবার নিজের কানে শুনতে শুনতে বুঝেছি যে, দরকার নেই 'প্রভূত' কারু-কৌশলের । যথার্থ আনন্দ দেয় রূপের সম্পূর্ণতায়- অতিসূক্ষ্ম, অতি সহজ ভঙ্গিমার দ্বারাইসেই সম্পূর্ণতা জেগে ওঠে ।"৪৫ তার অনাড়ম্বর রূপের কারণে কীর্তন যেমন একদিন সহস্র কন্ঠকে বরণ করে নিয়ে বাঙলার আকাশ-বাতাসকে মুখরিত করে বাঙালীর প্রাণের গান হয়ে উঠেছিল ঠিক তেমনি করে আরও একবার রবীন্দ্রসংগীত হয়ে উঠল বাঙালীর প্রাণের গান, তার সকল আবেগ-অনুভূতির আশ্রয় ।

রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সৃষ্টিসম্ভারের মধ্যে গান যে এত ব্যাপকতা নিয়ে জনমানসকে আবৃত করে ফেলেছে তা কেবলমাত্র তার গঠন বৈশিষ্ট্যের জন্য নয়, এখানে তার আরও একটি দিক রয়েছে । কোনো রচনা তখনই সাধারণের হয়ে ওঠে যখন তা স্রষ্টার অন্তঃকরণ থেকে স্বতোৎসারিত হয়, তাঁর কাছে সেটি হয় গভীর আনন্দের ও মুক্তির মাধ্যম । সংগীত রচনাতে রবীন্দ্রনাথ যে নিবিড় আনন্দ ও প্রবল আকর্ষণ বোধ করতেন তা জানা যায় তাঁরই কথায় - "...গান লিখতে আমার যেমন নিবিড় আনন্দ হয় এমন আর কিছুতে হয় না । এমন নেশায় ধরে যে, তখন গুরুতর কাজের গুরুত্ব একেবারে চলে যায়, বড়ো বড়ো দায়িত্বের ভারাকর্ষণটা হঠাৎ লোপ পায় । কর্তব্যের দাবিগুলোকে মন এক ধার থেকে নামঞ্জুর করে দেয় ।"৪৬ নিজের সৃষ্টির মধ্যে গান ছিল তাঁর কাছে সবথেকে প্রিয় এবং নিজের এই প্রিয় সৃষ্টির স্থায়িত্ব সম্পর্কে তিনি এতটাই আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন যে এডওয়ার্ড টমসনকে তিনি জানিয়েছিলেন, "if all my poetry is forgotten, my songs will live with my countrymen and have a permanent place."৪৭ রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে গানই হল সেই সৃষ্টি যেখানে খুঁজে পাওয়া যায় আত্মসচেতনতা-রহিত সত্যিকারের রবীন্দ্রনাথকে । গান তাঁর অবচেতন মন থেকে উৎসারিত; একথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন - "ছবি আর গান এ দুই আমার অবচেতন মন থেকে উৎসারিত ।"৪৮ এজন্যই বোধহয় সমগ্র রবীন্দ্র রচনার মধ্যে গানই আমাদের সবথেকে বেশী আকর্ষণ করে । এই প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর মত - "কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে, প্রবন্ধ-সমালোচনায় তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকদের একজন, নানা দিক দিয়ে তাঁর তুল্য অনেকেই; গানে তাঁর মতো কেউ নেই । গান তাঁর সবচেয়ে বড়ো, সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও বিশিষ্ট সৃষ্টি; সমগ্র রবীন্দ্র-রচনাবলীর মধ্যে গানগুলি সবচেয়ে রাবীন্দ্রিক ।"৪৯ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ক্ষিতিমোহন সেনের উপলব্ধি এখানে সংযোজন করলে বোধহয় বিষয়টি আমাদের কাছে আরও মর্মস্পর্শী হবে । তিনি বলেছিলেন - "তাঁর কাব্যই বলো আর নাটকই বলো, বা অন্য কোনো গদ্যরচনাই বলো, সব কিছুর মধ্যে দিয়েই মনে মনে হয়তো দেখবে তাঁর সেই দাড়ি জোব্বা উঁকি মারছে । তিনি যে রবীন্দ্রনাথ একথা তিনি ভুলতে পারতেন না । কিন্তু তাঁর গান রচনার সময়, আমি কাছ থেকে দেখেছি – তাঁর আত্মসচেতনতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতো, তখনই দেখতে পেতাম সত্যিকারের রবীন্দ্রনাথকে- একেবারে খোলস ছাড়ানো ন্যাংটো মানুষ ।"৫০ সুতরাং একথা বলা যেতে পারে যে, রবীন্দ্রনাথ গান রচনা করতে গিয়ে আত্মপোলব্ধির মাধ্যমে ভাবের যে উচ্চ শিখরে পৌঁছেছিলেন, সেখানে সৃষ্টি হয়েছিল এক গীতসমৃদ্ধ মেঘপুঞ্জের । এই মেঘপুঞ্জের অবিরামবর্ষণে অভিষিক্ত হয়েছে মানবজমিন, অঙ্কুরিত হয়েছে মানব মননের বীজ ।

কোনো সৃষ্টি তখনই সময়ের সাথে সাথে প্রাসঙ্গিক হয় যখন তার মধ্যে মানুষ বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পায়, যাকে আঁকড়ে ধরে মানবমনের একান্ত ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতিগুলি বেড়ে ওঠে । রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ পঁয়ষট্টি বছরের সংগীত রচনার ছেদ পড়েছিল বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের একেবারে প্রথমে । এরপর কালের নিয়মে কেটে গেছে দীর্ঘ সাড়ে-সাত দশক । বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতির সাথে আমদের জীবনধারায় ক্রমাগত ঘটে চলেছে অভাবনীয় সব পরিবর্তন । শিল্প-সাহিত্য-সংগীত প্রভৃতি বিনোদনের মাধ্যমগুলি দ্রুততার সাথে পরিবর্তিত হয়ে আজ তার ক্ষেত্রকে এতটাই বিস্তৃত করে ফেলেছে যে মানুষ ক্রমে তার নিজস্ব সূক্ষ্ম উপলব্ধিগুলিকে বিন্যস্ত করার কথা ভুলতে বসেছে । যান্ত্রিকতা ও কৃত্রিমতার পরিবেশে সরল স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ আজ বিলুপ্তির পথে । এই রকম পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রসংগীতের সহজ-সরল অনাড়ম্বর রূপটি মানুষের সকল অনুভূতিগুলিকে স্পর্শ করে যায় । রবীন্দ্রনাথের গান তাঁর আত্মোপলব্ধিজনিত সৃষ্টি যাতে প্রতিধ্বনিত হয়েছে মানব জীবনের সুর, সে সুর ফিরে ফিরে নাড়া দিয়ে যায় আমাদের চিত্তবীণায় । আমার মনে হয় মানব মনের এমন কোনো অনুভূতি নেই যা রবীন্দ্রসংগীতে প্রকাশিত হয়নি । রবীন্দ্রসংগীতের কিংবদন্তী শিল্পী সুচিত্রা মিত্র-এর কথায় - "এ জীবনে বড়ো কম আঘাত পাইনি । তবু বাঁচার আনন্দ নিবে যায়নি শত ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও । ... আমার তো মনে হয় এই যে বাঁচবার আগ্রহ, এই যে বিপদকে ভয় না করার শিক্ষা, জীবনকে নৈরাশ্যের সুরে অবিরত ভারাক্রান্ত করে না তোলা, এই যে আলো-বাতাস, আকাশ, মাটি এ সবই যেন আমার একান্ত আপনার মনে হওয়া- এ শিক্ষা গুরুদেবের গানের মধ্যে দিয়েই পেয়েছি । জীবনে এর থেকে বড় মন্ত্র, বড়ো আনন্দ আমার আর নেই, একথা আমি আজও বলব, যতদিন বাঁচব ততদিন বলব, আর বলবও গুরুদেবেরই গানের মধ্য দিয়ে ।"৫১ আরেকজন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীর আত্মোপলব্ধির কথাও এখানে বলা যায় । তিনি হলেন সুমিত্রা সেন ।তাঁর জীবনে রবীন্দ্রসংগীতের প্রভাব সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন - "রবীন্দ্রসংগীতের অতল গহনে আমি আকন্ঠ নিমজ্জিত হই । আমার জীবন দর্শন, মনন চেতনা সবই পরিবর্তিত হয় । ... রবীন্দ্রসংগীত আমার ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জীবনে একান্ত আশ্রয় হয়ে দেখা দেয় । রবীন্দ্রসংগীত আমাকে স্বর্গ সুখের স্পর্শ দেয় । এ সংগীত আমার আত্মার আত্মীয় ।"৫২ কারণ রবীন্দ্রসংগীত হল রবীন্দ্রনাথের চেতনার রোমন্থনের মাধ্যমে উঠে আসা সেই অমৃত, যার পরশে মানব মন বেঁচে থাকার আনন্দকে উপলব্ধি করতে পারে । তাই আমাদের পিপাসিত চিত্তের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য আমরা বারবার ছুটে যাই রবীন্দ্রগীতের সুধাসাগরের তীরে; আমাদের কথায়, চিন্তনে, মননে, শোকে, দুঃখে, বিরহে, সুখে, আনন্দে আশ্রয় খুঁজি তাঁর সংগীতের কাছে । ভাবলেও মনে জেগে ওঠে এক অনন্ত বিস্ময় যে, কোন অন্তর্জগতের উপলব্ধি থেকে সত্যদ্রষ্টার মত রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "বিশেষ করে বাঙালিরা, শোকে দুঃখে, সুখে আনন্দে, আমার গান না গেয়ে তাদের উপায় নেই। যুগে যুগে এ গান তাদের গাইতেই হবে"৫৩ । রবীন্দ্রনাথের এই বিমূর্ত সৃষ্টি জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে মূর্ত রূপ ধারণ করে প্রকাশিত হয়ে চলেছে আমাদের কাছে । জীবনের যাত্রাপথের গানে যে ধ্রুবপদ তিনি বেঁধে দিয়েছেন, তাতে এই সংগীতকে কেবলমাত্র চিত্ত বিনোদনের বিমূর্ত মাধ্যম ভাবলে ভুল করা হবে । তাই 'রবীন্দ্রসংগীত'কে মূর্ত কল্পনা করে নিয়ে তাঁর ভাষাতেই বলা যায় - 'মূর্তি তোমার যুগল সম্মিলনে সেথায় পূর্ণ প্রকাশিছে' ।

তবে এই আলোচনার প্রেক্ষিতে একটি ভাবনা মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে । নিবন্ধের প্রারম্ভেই বলা হয়েছে যে প্রকৃত শিক্ষার আলোকে আলোকিত শিক্ষিত রুচিশীল বাঙালির মননের ক্ষুন্নিবৃত্তির মাধ্যম হচ্ছে রবীন্দ্রসৃষ্টি যার মধ্যে অরুণচ্ছটা নিয়ে বিরাজিত রয়েছে রবীন্দ্রসংগীত । রবীন্দ্রসংগীতের স্বরূপটিকে কিছুটা হলেও যেটুকু উপলব্ধি করা গেল তাতে করে মনে হয় রবীন্দ্রসংগীতের অতল তলে অবগাহন করতে গেলে যে বুদ্ধিদীপ্ত মননশীলতা প্রয়োজন তা সমাজের সকল স্তরের মানুষের মধ্যে নেই । তাহলে এখানে একটি প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, একটি বিশেষ শ্রেণীর মধ্যেই তো রবীন্দ্রসংগীত সীমাবদ্ধ হয়ে রইল ? কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে রবীন্দ্রসংগীতের ধারা কম-বেশী আজ সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরের মধ্যে দিয়েই প্রবাহিত । তাহলে সকলেই কি রবীন্দ্রগীতের সুধারসে আকন্ঠ নিমজ্জিত ? গ্রীষ্মের দাবদাহে তৃষ্ণার্ত চাতকের মত সকলেই কি রবীন্দ্রসংগীতের নীরদপুঞ্জের কাছে শান্তিবারির প্রত্যাশী ? জোরের সাথে বোধহয় একথা বলা যাবে না । কারণ সমাজের সকল স্তরের এতটা মানবিক ও সাংস্কৃতিক উত্তোরণ বোধহয় এখনও সম্ভব হয়ে ওঠেনি । তাহলে কি কারণে রবীন্দ্রসংগীতের এত গ্রহণযোগ্যতা ? এখানে রবীন্দ্রসংগীতকে গ্রহণের দুটি দিক বোধহয় কাজ করছে । এক, সমাজের মননশীল মানুষ তাদের চিন্তায় ও মননে রবীন্দ্রসংগীতের প্রকৃত রূপটিকে উপলব্ধি করে নিরন্তর অনুশীলন ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে তাকে প্রসারিত করেছিলেন । আর একটি দিক হল, কোনো প্রকার উপলব্ধি ছাড়াই কেবলমাত্র শ্রুতি মাধুর্যের দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে আপামর বাঙালী একে গ্রহণ করেছিল; এখানে রবীন্দ্রসংগীতের নন্দনতাত্ত্বিকতা, তার ভাবের গভীরতা ইত্যাদি কোনো কিছুই তেমনভাবে প্রাধান্য পায়নি । প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত গবেষক সুধীর চক্রবর্তীর মতে, "রবীন্দ্রনাথ যে-কথা ভেবেই গান লিখে থাকুন বা সুর-পরিকল্পনা করুন শ্রোতারা তা বুঝে উপভোগ করেন সর্বদা তা না-ও হতে পারে। তাই যে-মানবিক বেদনাকে রূপ দেবার জন্য গানের আয়োজন তা হয়তো অজানা রয়ে যায় বেশিরভাগ শ্রোতার কাছে"৫৪। সুতরাং একথা বলা যেতেই পারে যে রবীন্দ্রসংগীতকে গ্রহণের ক্ষেত্রে উপরোক্ত দুইটি ধারা আজও সমভাবে বহমান ।

আমার নিজের একান্ত ব্যক্তিগত উপলব্ধির মাধ্যমে এখানে 'রবীন্দ্রসংগীত'কে কেবল জানার চেষ্টা করেছি মাত্র যা কখনোই শেষ হবার নয় । এই জানার পথেই সন্ধান পেলাম নতুন একটি শব্দবন্ধের - 'গীতময়ইন্দ্রধনু'; বুদ্ধদেব বসু এই শব্দবন্ধেই বিশেষিত করেছেন রবীন্দ্রনাথকে ।৫৫ বিশেষণটি আমাকে নতুন করে ভাবতে শেখাল, চিনতে শেখাল রবীন্দ্রনাথকে । সূর্যের আলোর মধ্যে নিহিত সাতটি বর্ণ যখন বিচ্ছুরিত হয়ে ইন্দ্রধনু হয়ে দেখা দেয় তখন সেখানে সাতটি বর্ণকে আমরা আলাদা আলাদাভাবে উপভোগ করি না, বর্ণগুলি পরস্পরের সাথে মিলিত হয়ে যে মনোমুগ্ধকর শোভা সৃষ্টি করে, তাই আমাদের দৃষ্টি ও মনের উপভোগ্য হয় । রবীন্দ্রসংগীতও এই রামধনুর মতই, যেখানে 'রবি'র অন্তর্জগতের আত্মচেতনার আলো কথা, সুর ও ভাবের সম্মিলিত বর্ণচ্ছটার মাধ্যমে বিচ্ছুরিত হয়ে প্রকাশিত হয় আমাদের কাছে; 'গীতময়ইন্দ্রধনু'র অবলোকনে মন পরিপূর্ণতা লাভ করে । আকাশে ঘন কালো মেঘের বজ্র নির্ঘোষে আগত ঝড়বাদলের পর নির্মল আকাশে সূর্যকিরণের প্রতিফলন রূপে সাতরঙের সম্মিলিত ইন্দ্রধনুর উদ্ভাসে মনে জেগে ওঠে এক অনির্বচণীয় আনন্দ । একইভাবে, সমাজ ও কর্মজীবনের নানাঘাত-প্রতিঘাতের কালো মেঘ যখনই আমাদের জীবনকে আচ্ছন্ন করে দেয় তখনই রবীন্দ্রসংগীত আমাদের বেদনা জর্জরিত ও ভারাক্রান্তমনকে প্রশান্তি ও শীতলতা দান করে, সকল দৈন্য দূরীভূত হয়ে প্রাণে জাগে সুখ । প্রকৃতপক্ষেই আমরা 'মরণ হতে যেন জাগি গানের সুরে' । পরিশেষে তাই এই প্রতিবেদকের একান্ত ব্যক্তিগত উপলব্ধি –জীবনাকাশে আমার মুক্তি 'রবি'র আলোয় ।

………… সমাপ্ত …………

Column Published - Index

তথ্যসূত্র:

১. বাণী-সঞ্চয়ন, স্বামী বিবেকানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১৩, পৃষ্ঠা - ২২

২. আমাদের সংগীত, সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ৭০

৩. Yeats's Introduction to Gitanjali, Gitanjali, S.Bhattacharyya and M.Chakraborty (Edit.), Parul, Fourth Reprint 2011, P.-255

৪. রবিকররেখা, সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, ২০১৪, পৃষ্ঠা - ২৫৩-৫৪

৫. জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির জীবনধারা ও গান, মানস বসু, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা - ২৯-৩৭

৬. জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির জীবনধারা ও গান, মানস বসু, দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা - ২৬৫

৭. শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সংগীতের স্থান, সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ৭৪

৮. আত্মকথা: ছেলেবেলা, সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ১৭৬

৯. গীতচর্চা, জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, আষাঢ় ১৪২১, পৃষ্ঠা-৮০

১০. রবীন্দ্রসঙ্গীতবিচিত্রা, শান্তিদেব ঘোষ, আনন্দ, নবমমুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৫, পৃষ্ঠা - ৭২

১১. রবীন্দ্রজীবনকথা, প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, আনন্দ, একাদশ মুদ্রণ ১৪১৮, পৃষ্ঠা - ১৬

১২. ভানুসিংহের কবিতা, জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, আষাঢ় ১৪২১, পৃষ্ঠা - ৮৫

১৩. পদরত্নাবলী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শ্রীশচন্দ্র মজুমদার কর্তৃক সম্পাদিত, আনন্দ, পৃষ্ঠা - ৯

১৪. সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ২১৮

১৫. রবীন্দ্রসঙ্গীতবিচিত্রা, শান্তিদেব ঘোষ, আনন্দ, নবমমুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৫, পৃষ্ঠা - ১৬০

১৬. সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ২৩৮-৩৯

১৭. গ্রন্থ সমালোচনা: আর্য্যগাথা, সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ২৯৫

১৮. বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, সাহিত্য সংসদ, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা - ৫২৭

১৯. বৈষ্ণব-রস-প্রকাশ, ড.ক্ষুদিরাম দাস, দে'জ পাবলিশিং, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৩, পৃষ্ঠা - ৩১০

২০. Kirtan and Cultural Tourism: A Study in Rarh Bengal, Dr. P. Chakrabarty and K. Biswas, Indian Journal of Landscape Systems and Ecological Studies, ILEE, Vol. 38, June 2015, P.-223-24

২১. বৈষ্ণব-রস-প্রকাশ, ড.ক্ষুদিরাম দাস, দে'জ পাবলিশিং, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৩, পৃষ্ঠা - ৩১২-১৩

২২. বাঙ্গলা কীর্তনের ইতিহাস, হিতেশরঞ্জন সান্যাল, কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানী, পৃষ্ঠা-১৫০

২৩. বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম, রমাকান্ত চক্রবর্তী, আনন্দ, পৃষ্ঠা-১৫২

২৪. বৈষ্ণব-রস-প্রকাশ, ড.ক্ষুদিরাম দাস, দে'জ পাবলিশিং, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৩, পৃষ্ঠা-৩১২-১৩

২৫. বৈষ্ণবপদাবলী, ড.সত্যগিরি, রত্নাবলী, ২০০৮, পৃষ্ঠা - ২০

২৬. পিতৃদেব, জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, আষাঢ় ১৪২১, পৃষ্ঠা - ৫০

২৭. বঙ্গে বৈষ্ণব ধর্ম, রমাকান্ত চক্রবর্তী, আনন্দ, পৃষ্ঠা-১৬১

২৮. পদরত্নাবলী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শ্রীশচন্দ্র মজুমদার কর্তৃক সম্পাদিত, আনন্দ, পৃষ্ঠা - ২৫৮

২৯. বৈষ্ণবপদাবলী, ড.সত্যগিরি, রত্নাবলী, ২০০৮, পৃষ্ঠা - ১৪০

৩০. পদরত্নাবলী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শ্রীশচন্দ্র মজুমদার কর্তৃক সম্পাদিত, আনন্দ, পৃষ্ঠা - ৯

৩১. বৈষ্ণব-রস-প্রকাশ, ড.ক্ষুদিরাম দাস, দে'জ পাবলিশিং, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৩, পৃষ্ঠা - ৩১৩

৩২. পদরত্নাবলী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শ্রীশচন্দ্র মজুমদার কর্তৃক সম্পাদিত, আনন্দ, পৃষ্ঠা - ৯

৩৩. কথা ও সুর, সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ৮১

৩৪. সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ৮৯-৯০

৩৫. সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ১০৫-১০৬

৩৬. বাল্মিকীপ্রতিভা, জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, আষাঢ় ১৪২১, পৃষ্ঠা - ১১৭

৩৭. রবীন্দ্রসঙ্গীতবিচিত্রা, শান্তিদেবঘোষ, আনন্দ, নবমমুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৫, পৃষ্ঠা - ২৮

৩৮. সংগীত ও ভাব, সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ১২

৩৯. গীতাঞ্জলির নন্দনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, মিত্রা বন্দোপাধ্যায়, মন্দাক্রান্তা, ২০১২, পৃষ্ঠা - ৫৬

৪০. গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ, জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, আষাঢ় ১৪২১, পৃষ্ঠা - ১২২

৪১. সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ৯৪

৪২. রবীন্দ্রসঙ্গীতবিচিত্রা, শান্তিদেব ঘোষ, আনন্দ, নবমমুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৫, পৃষ্ঠা - ৩

৪৩. রবিকররেখা, সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, ২০১৪, পৃষ্ঠা - ২৪৯-৫০

৪৪. রবিকররেখা, সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, ২০১৪, পৃষ্ঠা - ২২৫

৪৫. সংগীতচিন্তা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পুনর্মুদ্রণ ১৪১১, পৃষ্ঠা - ১১২

৪৬. রবিকররেখা, সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, ২০১৪, পৃষ্ঠা - ২১৮

৪৭. নির্জন এককের গান রবীন্দ্রসংগীত, সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, পঞ্চম মুদ্রণ ১৪২১, পৃষ্ঠা – ৭৭

৪৮. রবিকররেখা, সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, ২০১৪, পৃষ্ঠা - ২৩৮

৪৯. রবিকররেখা, সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, ২০১৪, পৃষ্ঠা - ২১৭

৫০. রবিকররেখা, সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, ২০১৪, পৃষ্ঠা - ২১৭

৫১. সুধাকন্ঠে সুধাগীত, সুভাষচৌধুরী, দেশ, ১৭জানুয়ারি, ২০১১, পৃষ্ঠা - ১০

৫২. রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভুবনে, সুমিত্রা সেন, রবীন্দ্রবীক্ষা, পারুল, পৃষ্ঠা - ৪০৫

৫৩. নির্জন এককের গান রবীন্দ্রসংগীত, সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, পঞ্চম মুদ্রণ ১৪২১, পৃষ্ঠা – ১০২

৫৪. নির্জন এককের গান রবীন্দ্রসংগীত, সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, পঞ্চম মুদ্রণ ১৪২১, পৃষ্ঠা – ৬২

৫৫. রবিকররেখা, সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, ২০১৪, পৃষ্ঠা - ২১৯

Musical programme organized by Geetabitan.com on the occasion of 25she Boishakh.

Maitreyee Banik Boishakhi Pronaam 2015

Priyangee Lahiry Boishakhi Pronaam 2015

Watch all programme videos

Rabindra Sangeet Artists

List of singers with their songs and musical career profile published in this website.

geetabitan profile

Collection of
Rabindra Sangeet

Sung by the talented and upcoming singers published in this site.

geetabitan profile