Rabindra Sangeet Albums. Sung by the verified singers of this website. 160 talented singers & over 850 songs.
Rabindra Sangeet Collections. Sung by the verified singers of this website. Nearly 500 unique Tagore songs.
Detail information about Rabindra Sangeet. All the lyrics, notations, background history with detail musical compositions, English translation and many more.
Atmo Jigyasar Onno Jagot
রবীন্দ্রনাথ ও গীতাঞ্জলিঃ আত্ম-জিজ্ঞাসার অন্য জগৎ
A column, titled Rabindranath and Geetanjali, written by Saurav Gangopadhyay on 15.06.2015.
ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক দর্শন নিজেকে জানার কথা বলে। "আত্মানং বিদ্ধি" – উপনিষদের এই ঋষি বাণীই ভারতীয় জীবনচর্চার মূল সুর। কিন্তু নিজেকে চেনার নিজেকে জানার এই জিজ্ঞাসা – এ কি ভারতবর্ষীয় ঐতিহ্য-চিহ্নিত দার্শনিক তত্ত্বমাত্র? যদি আমরা কখন চেয়ে দেখি, আমাদের চারপাশের এই প্রাত্যহিক দিন যাপনের সংঘর্ষে ক্ষয়ে আসা ঘোলাটে জগৎটার দিকে, আহলে দেখব মূলতঃ ওই আত্মবোধের সংকটজাত প্রশ্নটাকে বুকে নিয়েই আমাদের চারিপাশের প্রতিটি মানুষ প্রতিনিয়ত তাড়িত হয়ে চলেছে। মানুষের যাবতীয় চিন্তাভাবনার মূলে রয়েছে তার নিজেকে জানার আতুর আকাঙ্ক্ষা। এই প্রসঙ্গে মনে আসে টমাস মান-এর সেই বিখ্যাত উক্তি – 'মানুষ যেদিন নিজেকে জেনে নিতে পারে আপনার সত্য স্বরূপে, সেদিনই সে হয়ে ওঠে এক অন্য সত্তা'। নিজের মধ্যে এই অন্য আমিকে খুঁজে নেওয়ার সাধনাতেই ছিল রবীন্দ্রনাথের আজীবনের পথ চলা। নিজের ভেতর এক স্বতন্ত্র আমিকে আবিষ্কার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আর তাঁর বৃহত্তর জীবন বোধের ক্ষেত্রে এই ভেতরকার আমিই দেখা দিয়েছিল তাঁর জীবনদেবতার বেশে। "আমার নিগূঢ়তার মধ্যে যে একটি বৃহৎ অতিপুরাতন আমি আছে যে বিশেষরূপে আমার জীবনের দেবতা... আমি তাহাকেই ধরিয়া ফেলিবার চেষ্টায় উদয়াচল হাতড়াইয়া বেড়াইতেছি।" 'জীবনদেবতা'-র আলোয় নিজেকে জেনে নেওয়ার এই বাসনাই ব্যক্ত হয়েছিলো পর্ব থেকে পর্বান্তরে, কখনো গানে কখনো কবিতায়। -"তোমার মাঝে আমার আপনারে দেখতে দাও।"
'দেখে নেওয়ার' এই সাধনা শেষ হয়নি কোনদিন। জীবনযাত্রার এক এক স্তরে এক এক মূর্তিতে ধরা দিয়েছেন জীবনদেবতা। আকারে ইঙ্গিতে তাঁর 'নিগূঢ় আমি'-র ছায়া দেখেছেন কবি। তাই আপন হৃদয়-গহন-দ্বারে আজীবন কান পেতে থাকার পরেও ১৩২৯ সালের সেই গানে শুনি –
"কে সে মোর কেই বা জানে, কিছু তার দেখি আভা। কিছু পাই অনুমানে, কিছু তার বুঝি না বা॥"
আমরা জানি – গীতাঞ্জলি রচনার যুগ স্পর্শ করে রয়েছে ১৩১৩ থেকে ১৩২১ বঙ্গাব্দ – রবীন্দ্রজীবনে অধ্যাত্মচেতনা বিকাশের তুঙ্গতম সময়টিকে। কিন্তু গীতাঞ্জলি কি কবির অধ্যাত্ম-আকুলতার কবিতা? আমরা যদি একটুখানি অন্য দিক থেকে দেখার চেষ্টা করি, তাহলে দেখব আধ্যাত্মিক আলোড়নের পাশাপাশি গীতাঞ্জলিতে কতখানি সত্য হয়ে উঠেছে, গীতাঞ্জলি রচনার তিন বছরের ব্যবধানে এন্ডরুজকে লেখা চিঠির সেই বিখ্যাত উক্তিটি – "আমার জীবনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য একটাই... আমি যা তার ধ্যানরূপ সম্পূর্ণ হতে দেওয়া।" নিজের ধ্যানরূপকে সম্পূর্ণ করে তোলবার, আত্মসত্তার পূর্ণ বিকাশের এই সাধনার মধ্যেই গীতাঞ্জলীর অধ্যাত্ম ভাবনার মূল চাবিকাঠি। কেননা রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্ম জগতের ভিত্তিতে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর জীবনদেবতার কল্পনা। আর আগেই বলেছি যে জীবনদেবতা নানান রূপে নানান বেশে কবির জীবনে বারে বারে দেখা দিয়েছেন আলোছায়ার লুকোচুরি খেলায়, তিনি আসলে কবির নিগূঢ়তার সেই 'অতিপুরাতন' আমি। তাই রবীন্দ্র চেতনায় আত্ম-অন্বেষণের ধারাপথটিকে যদি আমরা অনুসরণ করি তবে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সে পথ আমাদের পৌঁছে দেবে দৈনন্দিন গতানুগতিকতার বহু ঊর্দ্ধে, এক অন্য ভাবলোকে।
গীতাঞ্জলি সম্পর্কে একদা লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন – "এ কেবলমাত্র আমার নিজের মনের কথা, আমারই প্রয়োজনে লেখা।" নিঃসংশয়ে গীতাঞ্জলিকে বলা যায় একপ্রকারের স্বগত কথন। আর সে অর্থে দেখতে গেলে যে কোন গীতি-কবিতাই তো রচিত হয় কবির ব্যক্তিগত আত্মচারণের তাগিদ থেকে। কিন্তু যে ভেতরকার আমি-কে জানতে কবির এই আতুর প্রয়াস সেই 'নিগূঢ়তার আমি' কি বহির্পৃথিবীর হাসি-কান্না, বিরোধ-বিদ্বেষ, আনন্দ-বিষাদ, সমস্ত কিছুর থেকে বিচ্ছিন্ন, স্বতন্ত্র কোন সত্তা? মনোজগতের সেই অতল গহনকে কি স্পর্শ করে না সমাজের উত্তাপ? একটু ভেবে দেখলেই মনে হয় যে তা সম্ভব ছিল না কোনদিন। রবীন্দ্রনাথ চিরজীবন নিজেকে দেখতে চেয়েছিলেন এই বিশ্বসংসারের আলো-ছায়ার মাঝে থেকেই। আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণের মাঝেখানেই তিনি পাততে ছেয়েছিলেন আপন আসন। তাই অসীম কালের যে হিল্লোলে, জোয়ার-ভাঁটায় ভুবন দুলেছিলো, নিজের নাড়ীতে রক্তধারায় তারই টান অনুভব করেন কবি। নিজের নিগূঢ়তমকেও উদ্ভিন্ন হতে দেখেন জগৎ সংসারের বিপুল বৈচিত্রের মাঝে। জীবনদেবতা – রবীন্দ্রনাথের এই কল্পনার সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্টই হল এই যে – আপন গূঢ়তম প্রদেশে কবি যে সত্তার অনুভব, নিখিল বিশ্বের হাসি কান্না ভরা সমস্ত ওঠা পড়ার মধ্যে তাঁরই রূপান্তর যেন ধরা পড়ে কবির চোখে। একদা 'চিত্রা'-য় রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন –
"জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে তুমি বিচিত্ররূপিণী। ... ... ... ... অন্তরমাঝে তুমি শুধু একা একাকী অন্তরব্যাপিনী॥"
তাঁর জীবনদেবতা-ভাবনায় এর চেয়ে বড়ো সত্য আর কিছু নেই। নিজেকে নিজের মধ্যে রেখে নয়, সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেবার মধ্যেই নিজের নিগূঢ়তার পরিপূর্ণ বিকাশসাধন, আত্মসত্তার পূর্ণ নির্মাণ – রবীন্দ্রচেতনার ভাবলোকে চিরকালের "সকল বাণীর সার" এই সত্য গীতাঞ্জলির যুগে এক নুতনতর আঙ্গিকে মূর্ত হল। অন্তরতমের সঙ্গে কবির যোগ – সেখানে বিশ্বসাথে, একযোগে –
"বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো॥"
পৃথিবীর সকল দেশের প্রায় সকল কবির সঙ্গে তাঁদের দেবতার নিবিড় নৈকট্যের সম্পর্ক আমরা দেখি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দেবতা একান্তভাবে অবস্থানগত কারণেই আর সকলের চেয়ে বিশিষ্ট। আলোচনার গোড়াতেই যে কথার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলাম – নিজেকে গড়ে তোলবার সাধনা – সে হয়তো কবি-জীবনের কোন একটি বিশেষ পর্যায়ের উপলব্ধি। তবে জীবনদেবতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের যে ধারাবাহিকতা তার ইতিহাসকে যদি পর্যালোচনা করে দেখতে চাই, তাহলে দেখব এ সাধনার বীজ নিহিত ছিল জীবনদেবতা কল্পনার প্রতিটি পর্বের কবি চেতনাতেই। প্রকৃতপক্ষে জীবনদেবতা বোধ রবীন্দ্রনাথের জীবনে একটা ধারাবাহিক সত্যের উদ্ভাস। কবির জীবনে তাঁর জীবনদেবতা প্রকাশ পেয়েছিলেন একটা বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে। আর এই বিবর্তনের ধারায় রবীন্দ্রনাথ আসলে দেখে নিতে চেয়েছিলেন নিজেকেই। জীবনদেবতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিচিত্রতা আসলে তাঁরই একটা বিচিত্রমুখী প্রকাশকে ফুটিয়ে তোলে। জীবনদেবতা তাই কবির জীবনে কখনো 'পিতা', কখনো 'মিতা', কখনো 'আপন সখার মতো', আবার কখনো 'জীবনস্বামী'-র রূপে ধরা দেন।তাঁর এই রূপ থেকে রূপান্তরে এগিয়ে চলা যে কোন একটি বিশেষ কালের বিশেষ কোন এক পরিকল্পনা জাত – এমন কথা মনে করার কোন কারণ নেই। কালের যাত্রায় জীবনপথের এক একটি বাঁক যেমন উপস্থিত হয়েছে কবির সামনে কবি নিজেকে ঠিক তেমন তেমন ভাবেই উপস্থাপিত করেছেন তাঁর জীবনদেবতার কাছে। আসলে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন নিজেরই সামনে। বলা যেতে পারে কবির নিজেকে চিনতে চাওয়ার, জানতে চাওয়ার এক মাধ্যম এই জীবনদেবতা। লক্ষ্য করলে দেখা যায় কবির জীবনের ওঠাপড়া কিভাবে ছাপ রেখে গিয়েছে সমসময়ের জীবনদেবতা রূপে, কবির সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধচিত্রণে। তাই কবি তাঁর জীবনদেবতার সঙ্গে কখনো ডুব দিয়েছেন বিশুদ্ধ রোমান্টিকতার অতল গহনে, কখনো বাস্তবের প্রখর রৌদ্রালোকিত মাটিতে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছেন সংসারের তাপ। আবার কখনো সে সম্পর্ক হয়ে উঠেছে কোন মানবিক ভাষা – অভিধার নাগাল না পাওয়া এক অনির্বচনীয়ের বাঞ্জনায় স্নিগ্ধ। গীতাঞ্জলি এই তৃতীয় যুগেরই কাব্য। এ যুগের জীবনদেবতার স্বরূপ, এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রকৃতি – বর্তমান পরিসরে এই হবে আমাদের আলোচ্য।
রবীন্দ্রনাথ ও গীতাঞ্জলিঃ আত্ম-জিজ্ঞাসার অন্য জগৎ