Rabindra Sangeet Albums. Sung by the verified singers of this website. 160 talented singers & over 850 songs.
Rabindra Sangeet Collections. Sung by the verified singers of this website. Nearly 500 unique Tagore songs.
Detail information about Rabindra Sangeet. All the lyrics, notations, background history with detail musical compositions, English translation and many more.
Atmo Jigyasar Onno Jagot
রবীন্দ্রনাথ ও গীতাঞ্জলিঃ আত্ম-জিজ্ঞাসার অন্য জগৎ
A column, titled Rabindranath and Geetanjali, written by Saurav Gangopadhyay on 07.08.2015.
ডঃ সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত গীতাঞ্জলির যুগ সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছিলেন "গীতাঞ্জলিতে একটি সুর খুব বেশী করিয়া ফুটিয়াছে; তাহা হইতেছে একান্ত আত্মবিলোপের সুর।" কিন্তু সত্যিই কি গীতাঞ্জলিকে আমিত্ব বিলোপের কবিতা বলা চলে? কোন সন্দেহ নেই গীতাঞ্জলি রবীন্দ্রনাথের নিজেকে কোন এক পরমের কাছে সঁপে দেওয়ার গান। কিন্তু নিজেকে বিলিয়ে দিয়েও কবির সত্তা তো আত্মসচেতনতা হারায় নি। তাঁর জগতের কেন্দ্রে নিজের স্থান সম্পর্কে কব প্রত্যয়ভূয়িষ্ঠ। কবির ঘরের আঁধারটুকু দূর হলেই সফল হবে এই আকাশজোড়া তারার আলো। কবির জীবনের দেবতা জন্ম-জন্মান্তর ধরে মিলতে চেয়েছেন শুধু তাঁরই সঙ্গে। -
"আমার মিলন লাগি তুমি আসছ কবে থেকে!"
এরই সমান্তরালভাবে গীতাঞ্জলিতেই পাই –
"তাই তোমার আনন্দ আমার'পর তুমি তাই এসেছ নীচে – আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে॥"
গীতিমাল্যের গানে বলেছেন –
"তুমি যে চেয়ে আছ আকাশ ভ'রে, নিশিদিন অনিমেষে দেখছ মোরে॥ আমি চোখ এই আলোকে মেলব যবে তোমার ওই চেয়ে-দেখা সফল হবে, এ আকাশ দিন গুনিছ তারি তরে॥"
জীবনদেবতার সঙ্গে একযোগে মিলতে পারলেই কবির জীবনে সব আনন্দের সার্থকতা।
"তোমার আমার মিলন হলে সকল যায় খুলে – বিশ্বসাগর ঢেউ খেলায়ে উঠে তখন দুলে।"
কবির জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যও জীবনদেবতার লীলাকেই সার্থক করে তোলা –
"আমার মাঝে তোমার লীলা হবে তাইতো আমি এসেছি এ ভবে॥"
গীতাঞ্জলি নিজের দেবতার সঙ্গে কবির এক যুগল লীলার কাব্য। সেখানে ন্যূন নয় কেউ। উভয়েই উভয়ের মহিমায় সমুজ্জ্বল।
"তাই তো, প্রভু যেথায় এল নেমে তোমারি প্রেম ভক্তপ্রাণের প্রেমে মূর্তি তোমার যুগলসম্মিলনে সেথায় পূর্ণ প্রকাশিছে॥"
গীতাঞ্জলি থেকে গীতিমাল্য হয়ে গীতালি, আত্মসত্তার পূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যে এই যে কবির মানসযাত্রা সে যেন ধীরে ধীরে এসে পরিসমাপ্তি পেয়েছে প্রশান্ত গভীর এক অনুভবের মাঝে। 'পরিসমাপ্তি' কথাটার ব্যবহার হয়তো সংগত নয়, কেননা এর পরবর্ত্তী যুগেই বলাকার হাত ধরে রবীন্দ্রনাথের আত্মজিজ্ঞাসা পৌঁছবে এক অন্য জগতে। আসলে এতো এক নিরন্তর প্রবাহ। কিন্তু তবু বলতে পারি জাগতিক বিরোধ সংক্ষোভের দিনে নিজের জীবনের দেবতা চিনতে চাওয়ার আতুর প্রয়াস গীতালিতে এসে একটা কুলে মিলতে পেরেছিল। কবি অনুভব করেছিলেন, সুখের দিনে যার হাসি "আলোকে ঢেলে পড়ে" দুঃখরজনীর বেদনার দান তাঁরই। সেই হৃদয়বিহারী বেদনায় জীবনের পেয়ালা ভরে তুলতে পারলেই পরমপ্রিয় ধরা দেবেন অনুভূতির গভীরে। তাই গীতালিতে এসে শুনি কবির প্রত্যয়ভুয়িষ্ঠ কণ্ঠস্বর –
"অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো, সেই তো তোমার আলো॥"
ডঃ উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতে,"গীতালিতে আসিয়াই কবির অধ্যাত্মজীবন শেষ পরিণতি লাভ করিল। খেয়ার আকুল আকাঙক্ষা ও প্রতীক্ষা, গীতাঞ্জলির হতাশা ও বিরহ-বেদনা, গীতিমাল্যের যুগল প্রেমলীলা ও বিরহানুভুতি - গীতালিতে পরিপূর্ণ উপলব্ধি ও আত্মসমর্পনে সার্থকতা লাভ করিল।"
"আমার জীবনে নিরন্তর ভিতরে একটি সাধনা ধরে রাখতে হয়েছে। সে সাধনা হচ্ছে আবরণ মোচনের সাধনা।" গীতাঞ্জলি শুধু নিজেকে গড়ে নেওয়ার গান নয়, গীতাঞ্জলি রবীন্দ্রনাথের সেই আবরণ মোচনের সাধনা। প্রতিদিনকার ছোট বড় সাংসারিক নানা ঘটনার আবর্তের মধ্য দিয়ে যে 'আমি'-কে আমরা বয়ে বেড়াই সে আমি গ্লানিময়, Kierkegaard - এর ভাষায়"ভাঙা-ছেঁড়া"। কিন্তু তার বাইরে শিলার সেই যে বলেছিলেন এক আদর্শ মানুষের সম্ভাবনার কথা, কিংবা এমার্সনের 'active soul', যে মিশে আছে প্রতিটি মানব সত্তায়, রবীন্দ্রনাথ তাকেই ধরতে চেয়েছিলেন। ভেলরির ভাষায় বলতে গেলে, এ এক অন্যতর জাগরণের সাধনা। কীটস, শেলী, ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ এমনকি টেনিসন প্রতীচ্যের রোমান্টিকতার এই সব শীর্ষপুরুষদের লেখায় বারবার করে যে চিরন্তন আমি'তে জেগে ওঠবার কথা আমরা পাই, আমাদার প্রাচ্যকবিও যে সেই আদর্শেই প্রভাবিত সেই কথা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয় গীতাঞ্জলি। তাই রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন -
"রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে তোমায় আমায় দেখা হল সেই মোহনার ধারে।"
আমাদের মনে আসে ওয়ার্ডস্ওয়ার্থের কবিতা -
"Gently did my soul Put off her veil and self-transmuted stood Naked, as in the presence of god"
দান্তে একদা বলেছিলেন - "পৃথিবীর দুই প্রান্তের অচেনা দুই কবি মাঝে মাঝে মুখোমুখি কথা বলেন। আমরা চেয়ে দেখি এক অদ্ভুত সমভূমিতায় উপনীত হয় প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের আত্মসন্ধান। আর গীতাঞ্জলিকে বুঝতে গেলে চাইতে হয় রবীন্দ্রনাথের আজীবন উপনিষদ চর্চার পানে।" এর কেন্দ্রে আছে হেমন্তবালা দেবীকে লেখা চিঠির এই ক'টা কথা - "উপনিষদ মানুষের আত্মার মধ্যে পরমাত্মার সন্ধান দেয়।" শঙ্খ ঘোষের মতে গীতাঞ্জলি 'চিরায়ত ঐতিহ্যের কবিতা।'
আমি'র আবরণ মোচনের বা নিজেকে গড়ে তোলার এই যে সাধনা গীতাঞ্জলি থেকে গীতালিতে তা মূলতঃ এক সূত্রে গাঁথা হলেও কোথায় যেন একটা 'সূক্ষ্ম স্তর পেরিয়ে আসার ছাপ খুঁজে পাই এই উত্তোরণের গানগুলিতে। গীতাঞ্জলিতে রয়েছে এক বেদনা, দৈনন্দিন গ্লানিময় সেই ভাঙা-ছেঁড়া আমি'কে নিজের মধ্যে বয়ে বেড়ানোর বেদনা, পাস্কালের ভাষায়, 'আমি'-ময় ছদ্মপোশাক"টি দিয়ে নিজেকে ঘিরে রাখবার বেদনা -
"আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে ॥"
রবীন্দ্রনাথ ও গীতাঞ্জলিঃ আত্ম-জিজ্ঞাসার অন্য জগৎ