Rabindra Sangeet Albums. Sung by the verified singers of this website. 160 talented singers & over 850 songs.
Rabindra Sangeet Collections. Sung by the verified singers of this website. Nearly 500 unique Tagore songs.
Detail information about Rabindra Sangeet. All the lyrics, notations, background history with detail musical compositions, English translation and many more.
Atmo Jigyasar Onno Jagot
রবীন্দ্রনাথ ও গীতাঞ্জলিঃ আত্ম-জিজ্ঞাসার অন্য জগৎ
A column, titled Rabindranath and Geetanjali, written by Saurav Gangopadhyay on 15.07.2015.
গীতাঞ্জলির যুগে (গীতাঞ্জলি-গীতিমাল্য-গীতালি) অসংখ্য গানে কবিতায় কোন এক 'তুমি' সম্বোধিত হয়েছে বারবার। "আজ আমি যে বসে আছি তোমারই আশ্বাসে", "কবে আমি বাহির হলেম তোমারই গান গেয়ে", "ওদের কথায় ধাঁদা লাগে, তোমার কথা আমি বুঝি" প্রভৃতি পংক্তি তার সাক্ষ্য বহন করছে। প্রশ্ন হচ্ছে – কে এই 'তুমি'? ইনিই কি কবির জীবনদেবতা? গীতাঞ্জলির অসংখ্য গানে এই 'তুমির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেহারাটা আভাসিত দেখি। আবার গীতাঞ্জলিতেই এমন বহু গানের সন্ধান মেলে যেখানে দেখি রবীন্দ্রনাথের এই 'তুমি' হয়ে উঠেছেন বিশ্বজগতের। রবীন্দ্রনাথ নিজেই যাকে চিহ্নিত করেছেন "ত্রিভুবনেশ্বর" বলে।
'দেখে নেওয়ার' এই সাধনা শেষ হয়নি কোনদিন। জীবনযাত্রার এক এক স্তরে এক এক মূর্তিতে ধরা দিয়েছেন জীবনদেবতা। আকারে ইঙ্গিতে তাঁর 'নিগূঢ় আমি'-র ছায়া দেখেছেন কবি। তাই আপন হৃদয়-গহন-দ্বারে আজীবন কান পেতে থাকার পরেও ১৩২৯ সালের সেই গানে শুনি –
"আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে॥"
কবি নিজের একান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাত্রটিকে যে খুঁজে নিতে চাইছেন বিশ্বদেবতার মাঝে। প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের প্রথাবদ্ধ গণ্ডিতে পরিমাপ হয় না – এই হল রবীন্দ্রনাথের দেবত্ব কল্পনার, ঈশ্বর-ভাবনার বিশেষত্ব। গীতাঞ্জলির যুগের এই যে ঈশ্বর, ইনি বিশ্বদেবতা। অথচ এরই মাঝে নিজের জীবনদেবতাকে দেখে নেওয়ার কবির যে প্রয়াস সে আমাদের চোখে জন্ম দিল এমন এক অধ্যাত্মলোকের যেখানে ঈশ্বর, মানুষ, প্রকৃতি মিলে গিয়ে জন্ম নিয়েছে এর ত্রিবেণীধারার নিরন্তর প্রবাহ। - "মানুষ ও ঈশ্বরকে বষ্টন করে অধ্যাত্মভাবনায় কেন্দ্রিত গীতাঞ্জলি-ত্রয়ীর ভাবজগৎ।"
'চিত্রা-চৈতালী' বা তৎপূর্ববর্ত্তী যুগপর্যায়ে যখন রবীন্দ্রনাথ রচনা করে চলেছেন একের পর এক ব্রহ্মসঙ্গীত, সেখানে পাচ্ছি কোন এক 'রাজরাজ' 'বিশ্বরাজ'-এর কথা। কিন্তু সমকালের জীবনদেবতার সঙ্গে বা কবির অন্তরতমের সঙ্গে তাঁর ঠিক প্রকৃতিগত মিল আমরা যেন পাই না। চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ সে যুগের জীবনদেবতা সম্বন্ধে নিজেই বলেছেন "ধর্মশাস্ত্রে যাহাকে ঈশ্বর বলে তিনি বিশ্বলোকের, আমি তাঁহার কথা বলি নাই। ... যিনি আমার এবং আমি যাঁহার ... চিত্রা কাব্যে – তাঁহারই কথা আছে" এই জীবনদেবতা ঠিক ঈশ্বর নন। বলা যায় কবির 'গভীর গোপনে' প্রদোষের ছায়ান্ধকারে ইনি এক 'আধফুট' স্বপনবিহারী, এক অদ্ভুত রোমান্টিকতার মায়াবরণে আবৃত। কিন্তু সে মায়াবরণটা কেটে গেল যেদিন "জীবনের রণক্ষেত্রে / দিকে দিকে জেগে উঠল সংগ্রামের সংঘাত / গুরু গুরু মেঘমন্দ্রে।" সামাজিক সাংসারিক নানা উপপ্লবে মৃত্যুশোকের অভিঘাতে বিশ-শতকের গোড়ায় রবীন্দ্র-জীবনে যে বাত্যাবিক্ষোভ জন্ম নিয়েছিল, সমসময়ের অন্তর্লোক হয়তো তারই ফলশ্রুতিতে অন্তরতমের আসনটা পাতা হয়ে যাচ্ছিল "বিশ্বরাজ্য মাঝে"। 'নৈবেদ্য'-র যুগের দেবতা, তিনি উপনিষদে বর্ণিত ঈশ্বর – দুঃখরাতে অন্ধকারে আসেন রণগুরুর মতো, পিতৃবেশে। গীতাঞ্জলির যুগে যিনি এলেন, তিনিও ঈশ্বর, কিন্তু রোমান্টিকতার মধুর আবেষ্টনের তাঁর আবির্ভাব। বর্ষণমন্দ্রিত অন্ধকারে, শ্রাবণঘনগহন মোহে কবির চিত্তদুয়ারে যাঁর আবির্ভাব, তিনিও দেবতা, কিন্তু তিনি কবির 'প্রিয়তম'। গীতাঞ্জলির সঙ্গে 'নৈবেদ্য'-র ফারাকটা এইখানে। গীতাঞ্জলির যুগে এসে রবীন্দ্রচেতনায় পূজা ও প্রেমের সমান্তরাল দুটি ধারা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথে জীবনদেবতা আসলে এই বিশ্বের দেবতারই এক অন্যতর বিচিত্র প্রকাশ। কবির জীবনে জীবনদেবতার উদ্ভব তাঁর অধ্যাত্মবোধের উৎস থেকেই। এই জীবনদেবতার আবির্ভাবেই কবি হয়ে ওঠেন 'দেবতাত্মা'। আপন নিগূঢ়তার এই 'আমি'-র যোগেই ঈশ্বরের সঙ্গে কবির যোগ। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেন – 'তাহার সহিত প্রেমের আনন্দে যুক্ত হইয়া পরস্পরকে সম্পূর্ণ করিয়া তুলিতে পারিলে তবেই অতিজগতের সহিত জগতের নিত্য প্রেমের সম্বন্ধ আপনার মধ্যেই বুঝিতে পারিব।' অনিবার্যভাবেই আমাদের মনে পড়ে যায় নীটশের কথা, যিনি মানুষকে দেখেছিলেন অবমানব আর অতিমানবের মধ্যবর্ত্তী এক সেতু রূপে। নীটশের মানবিক সাধনার লক্ষ্যই ছিল নিজে কোন পরিণাম না হয়ে, নিজের মধ্যে বৃহত্তর এক পরিণামকে অর্জন করা। রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতার কল্পনায়, বিশেষতঃ গীতাঞ্জলির যুগে পাশ্চাত্য দর্শনের এই তত্ত্বের এক অন্যতর প্রকাশকেই আমরা লক্ষ্য করি। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা যায় টম্পসনের রবীন্দ্রজীবনীর উক্তি – "He found a deep and intimate communication with God into which Jivandebata feeling merged."
পাশ্চাত্যের অস্তিত্ববাদী দর্শন বলে নিজেকে চিনে নেওয়ার মানবিক আকাঙ্ক্ষার জন্য দুঃখরাতের অন্ধকারের মানুষ যখন পৌঁছে যায় বিভ্রান্তির শেষ সীমানায়, যখন আর কোন পথ বাকী থাকে না, তখনই সে ঝাঁপ দেয় আপন অধ্যাত্মলোকের গহনে। নিজের ধ্যানরূপকে সম্পূর্ণ হতে দেওয়ার যে সাধনলক্ষ্যে শেষ পর্যন্ত স্থির ছিল রবীন্দ্রজীবন, এই পরিপূর্ণ আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়েই তার এক সুস্পষ্ট প্রকাশ গীতাঞ্জলির যুগে –
"আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে। সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥"
Soren Kierkegaard বোধহয় এই আত্মনিবেদনকেই চিহ্নিত করেন "the existentialist leap to faith." বলে। গীতাঞ্জলির এই আত্মসত্তার স্বরূপাবিষ্কারের সাধনাকে আমরা অনায়াসে তাঁর ভাষায় বলতে পারি "a total personal confrontation". এ যেন আত্মচেতনার এক নগ্ন সম্মুখীনতা। আত্মসন্ধানী মানুষের যে তিন অস্তিত্বের কথা Kierkegaard-এর দর্শনে আমরা পাই তারই সূত্র ধরে গীতাঞ্জলির অধ্যাত্ম সাধনাকে বলা যায় "...leap from … subjective self-assertion to self surrender by the shock of despair." যে "দ্বন্দ্বের দুঃখ, বিপ্লবের আলোড়ন" এ ছেয়ে রয়েছে নৈবেদ্য'র কালপর্ব, তারই পরিণতিতে গীতাঞ্জলির সাধনার শুরু। এ সাধনা এক পরিপুর্ণ আত্মনিবেদনের মধ্যে আপন ধ্যানরূপসম্পূর্ণতার সাধনা।
"গীতাঞ্জলি থেকে গীতালি" আত্মসন্ধানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের এ এক অন্যতর আত্মপ্রতিষ্ঠার যুগ। গীতাঞ্জলির আদ্যন্ত আচ্ছন্ন করে রয়েছে এক ঐশ্বরিক চেতনার নির্যাস। আধুনিক কালের এক সমালোচক মন্তব্য করেছেন, গীতাঞ্জলি কবির সঙ্গে তাঁর দেবতার নিভৃত কিছু সংলাপের কবিতা। আসলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রায় সকলেই প্রায়শই সত্যের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে চলি কিছু ঝাপসা অনিশ্চিতের আকর্ষণে। গীতাঞ্জলি রবীন্দ্রনাথের "শান্তিময় বৈরাগ্যের মাঝে জগতের নিগূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার স্বরূপাবিষ্কার" এর কবিতা। এই স্বরূপাবিষ্কারই রচনা করেছে গীতাঞ্জলির ঐশ্বরিক পরিমণ্ডল। যে আমি-তুমির সংলাপে ভরে রয়েছে গীতাঞ্জলি থেকে গীতালির যুগপর্ব, সে আসলে রবীন্দ্রনাথের আত্মচেতনারই দ্বৈধ – অনেকটা যেন 'split personality'-র মতো। শ্লেগেল একদা বলেছিলেন, আমরা যখন ভাবি, অধিকাংশ সময়ই আমরা তখন কথা বলি নিজেদের সঙ্গে। স্পষ্টতঃই আমাদের চেতনায় তখন জন্ম নেয় দুটো সত্তা। আত্মসত্তায় এই আমি-তুমির দ্বৈধ কল্পনা শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, দেশে দেশে কালে কালে অসংখ্য ভাবুক ধ্যানী মানুষদের মধ্যেই পেয়ে থাকি। একে তাঁরা দিয়েছেন এক ঈশ্বর ভাবুকতার মূর্তি। সে অর্থে গীতাঞ্জলিকে রবীন্দ্রনাথে ঐশ্বরিক চেতনার কবিতা বললে খুব ভুল বলা হবে না।
রবীন্দ্রনাথ ও গীতাঞ্জলিঃ আত্ম-জিজ্ঞাসার অন্য জগৎ