Rabindra Sangeet Albums. Sung by the verified singers of this website. 160 talented singers & over 850 songs.
Rabindra Sangeet Collections. Sung by the verified singers of this website. Nearly 500 unique Tagore songs.
Detail information about Rabindra Sangeet. All the lyrics, notations, background history with detail musical compositions, English translation and many more.
Atmo Jigyasar Onno Jagot
রবীন্দ্রনাথ ও গীতাঞ্জলিঃ আত্ম-জিজ্ঞাসার অন্য জগৎ
A column, titled Rabindranath and Geetanjali, written by Saurav Gangopadhyay on 15.09.2015.
গীতালিতে এসে রবীন্দ্রনাথ নিজের মধ্যে অনুভব করলেন এক নতুন 'আমি'-কে, যে আমি প্রাত্যহিক তুচ্ছতার বহু ঊর্ধ্বে। নিজের ভেতর এই দুই আমিকে জাগিয়ে তোলার যে খেলায় গীতালিতে মাতলেন রবীন্দ্রনাথ, তারই সমান্তরালভাবেই যেন ভেসে আসে কয়েক বছর বাদে লেখা একটি গানের এই কথাগুলো –
"ওযে সদাই বাইরে আছে, দুঃখে সুখে নিত্যনাচে ঢেউ দিয়ে যায়, দোলে যে ঢেউ খেয়ে। একটু ক্ষয়ে ক্ষতি লাগে, একটু ঘায়ে ক্ষত জাগে ওরই পানে দেখেছি আমি চেয়ে ॥ ... ... ... এই যে আমি ওই আমি নই আপন মাঝে আপনি যে রই যাই নে ভেসে মরণ ধারা বেয়ে মুক্ত আমি তৃপ্ত আমি, শান্ত আমি দীপ্ত আমি ওরই পানে দেখেছি আমি চেয়ে ॥ তোমার খোঁজা শেষ হবেনা মোর"
রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা-কেন্দ্রিক যাবতীয় প্রশ্নের অন্তিম উত্তর বোধহয় এই। নিজের নিগূঢতম আমি'কে উদয়াচল হাতড়ে বেড়াবার যে সত্য ব্যক্ত হতে দেখেছিলাম 'চিত্রা'-র যুগে, উত্তরযুগের অসংখ্য গানে কবিতায় তাকেই পেয়েছি বারেবারে নানা ভঙ্গিতে। গীতাঞ্জলির এ কবিতাও সেই সত্যকেই আরেকবার তুলে ধরে। এর পাশে অনায়াসেই রাখতে পারি টম্পসনের দেওয়া সেই রবীন্দ্র-ভাষ্যকে -"When the Jibandebata came to me, I felt overwhelming joy - it seemed a discovery new with me, in this deepest self-seeking expression. I wished to sink into it-to give myself up to it. Today I am on the same plane as my readers, I am trying to find what the Jibandebata was."
জীবনের দেবতাকে নিজের আলোয় চিনে নেওয়ার বা জীবনদেবতার আলোয় নিজেকে নিজের কাছে তুলে ধরার এই যে "ধ্যানরূপ সম্পূর্ণ হতে দেওয়ার সাধনা" এ ছিল রবীন্দ্রনাথের আজন্ম পরম সাধন। শেষ জীবনে 'Hibbert Lectures' এ নিজের ধর্ম সম্বন্ধে ব্যাখ্যা দিতে গিয়েও তিনি এনেছেন জীবনদেবতার প্রসঙ্গ। তাঁর জীবনের সমস্ত চলা বসায় জড়িয়ে রয়েছে যে সত্তা তাকেই উদ্দেশ্য করেই পরিশেষে বলেছিলেন কবি -
"আমি ভাবি মনে মনে তাহারে কি চিনি সুখে দুঃখে দিনে দিনে বিচিত্র যে আমার পরাণে।"
রচনাবলির ব্যাখ্যায় জীবনদেবতা প্রসঙ্গে কবির নিজের কথা পাই "আমার একটি যুগ্ম সত্তা - সে আমারই ব্যক্তিত্বের অন্তর্গত - তারই সংকল্প পূর্ণ হচ্ছে আমার মধ্য দিয়ে আমার সুখে দুঃখে আমার ভাল মন্দয়।" এর পাশে বিনা আয়াসেই আমরা ফুটিয়ে তুলতে পারি "গীতাঞ্জলির সেই আবেদনের সুর -
"তোমার ইচ্ছা করো হে পূর্ণ আমার জীবন মাঝে।"
গীতাঞ্জলি আসলে জীবনের দেবতার সঙ্গে নিজেদের মেলাতে চাওয়ার কাব্য। বুদ্ধদেব বসু একেবলেছিলেন এক পরম মিলনাকাঙ্ক্ষার কবিতা। নিঃসংশয়ে বলা যায় রবীন্দ্রচেতনায় অধ্যাত্মভাবনার দিগন্ত স্পর্শ করে থাকা গীতাঞ্জলির ভাবলোক "এক প্রভুময় ভবন"।
তবু শেষ পর্যন্ত, কোথায় যেন এ কাব্যরবীন্দ্রনাথের আত্মজিজ্ঞাসার এক অন্য জগতকে তুলে ধরে আমাদের চোখে। সেই যে অজিতকুমার চক্রবর্তীকে একদা চিঠেতে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, "আমার মধ্যে এমন আমি আছে, যে আমার চেয়ে বড়ো, আমার মধ্যে তাকে কুলোবে কী করে"। গীতাঞ্জলি যেন সেই 'বড়ো আমি'-কেই খুঁজে নেওয়ার গান। যে পরমতার ছায়া গীতাঞ্জলির প্রতিটি পংক্তিকে অভিষিক্ত করে রেখেছে। তার বিশ্লেষণ কোন প্রথাগত ধর্মীয়তার গণ্ডীতে করা যায় না। সে অনুভুতির ছোঁয়া মেলে প্রাত্যহিক দিনযাপনের নিভৃত অবসরে নিজের সঙ্গে আমাদের মুখোমুখি মেলাবার মুহূর্তটিতে। নিজেকে এক অন্যতর সমগ্রতার মধ্যে জাগিয়ে তোলার গান গীতাঞ্জলি। নিজেকে নিজের মধ্যে ছোটো করে রাখা নয়, নিজেকে সবের মধ্যে এক করে দেখতে পারার মধ্যেই আমাদের মুক্তি।
"আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে, দুঃখবিপদ তুচ্ছ করা কঠিন কাজে। বিশ্বধাতার যজ্ঞশালা আত্মহোমের বহ্নি জ্বালা জীবন যেন দিই আহুতি মুক্তি-আশে।"
এরই সমান্তরাল যেন ধ্বণিত হতে দেখি জীবনের উপান্তবেলায় পৌঁছে মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর কাছে বলা সেই কথাগূলো – "আমি কোন দেবতা সৃষ্টি করে প্রার্থনা করতে পারিনে"। নিজের কাছ থেকে নিজের যে মুক্তি সেই দুর্লভ মুক্তি পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই বিশ্বজোড়া আনন্দের যজ্ঞশালায় দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত দুঃখশোক কী সহজ হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে -
"তোমার যজ্ঞে দিয়েছ ভার বাজাই আমি বাঁশি গানে গানে গেঁথে বেড়াই প্রাণের কান্না-হাসি।"
পুত্রবিয়োগের ক্ষত মুখে কী সহজে জেগেছিল সুর –
"প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে প্লাবিত করিয়া নিখিল দ্যুলোকে ভূলোকে তোমার অমল অমৃত পড়িছে ঝরিয়া।"
গীতাঞ্জলির এই আত্মোপলব্ধির গানই যেন কোথায় এসে সমে মিলে যায় গীতালির সুরে -
"সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি দুঃখে তোমায় পেয়েছি প্রাণ ভ'রে।"
আদ্যন্ত ঐশ্বরিকতায় আচ্ছন্ন রবীন্দ্রনাথে গীতাঞ্জলি তার আত্মজিজ্ঞাসার ধারাবাহিকতায় একটা খণ্ডযুগ, এ কথা আমরা বলতেই পারি। এ জিজ্ঞাসার প্রবাহ চলেছে রূপ থেকে রূপান্তরে (এক অনন্ত সম্ভাবনার চিহ্ন বুকে নিয়ে)। গীতাঞ্জলির যে গানে বলেছিলেন –
"কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।"
তারই সূত্র ধরে আমরা যেন পেয়ে যাই তার আত্ম-অনুসন্ধানের চিরকালের সত্য –
"আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না আমার ফুরাবে না॥"
………… সমাপ্ত …………
তথ্যপঞ্জীঃ ১. রবীন্দ্রনাথ: শ্রী সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ২. রবীন্দ্রকাব্যের পুনর্বিচার: শ্রী শুভ্রাংশু ভূষণ মুখোপাধ্যায় ৩. রবীন্দ্রনাথ: শ্রী সুপ্রিয় ঠাকুর ৪. রবীন্দ্র জীবনী (১,২): শ্রী প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় ৫. এ আমির আবরণ: শ্রী শঙ্খ ঘোষ ৬. নির্মাণ ও সৃষ্টি: শ্রী শঙ্খ ঘোষ ৭. গীতাঞ্জলি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৮. গীতবিতান: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৯. সঞ্চয়িতা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১০. মংপুতে রবীন্দ্রনাথ: মৈত্রেয়ী দেবী ১১. কাব্য পরিক্রমা: অজিত কুমার চক্রবর্তী ১২. আত্ম পরিচয়: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩. রবীন্দ্রনাথ এনড্রুজ পত্রাবলি : মলিনা রায় ১৪. রবীন্দ্র প্রসঙ্গ: তথ্য সংস্কৃতি বিভাগ, পঃবঃ সরকার ১৫. রবীন্দ্রনাথ ও নোবেল পুরস্কার: সংকলন ও সম্পাদনা – বিজিতকুমার দত্ত, সমকালীন তথ্য ১৬. The God of Rabindranath Tagore: Jose Chunkapura ১৭. The Chief Currents of Contemporary Philosophy: D.M. Dutta
রবীন্দ্রনাথ ও গীতাঞ্জলিঃ আত্ম-জিজ্ঞাসার অন্য জগৎ